↑SC
MCC logo
MCC Newsletter
September 2026
HomeBack to September issueContribute

Qur’anic reflection

দারসুল কুরআন:সূরা আত তাহরীম:১০-১২

By Farzana Yeasmin

Share
f𝕏W✉

🔰দারসুল কুরআন
সূরা আত তাহরীম:১০-১২ নং আয়াত
মোট আয়াত:১২

✅নামকরণ

১ম আয়াতের لِمَ تُحَرِّمُ শব্দ থেকে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।

✅নাযিলের সময়কাল

এ সূরার মধ্যে তাহরীম সম্পর্কিত যে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে সে সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনাসমূহে দু’জন মহিলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা দু’জনই নবীর (সাঃ) স্ত্রী। তাঁদের একজন হলেন হযরত সাফিয়া (রাঃ) এবং অন্যজন হযরত মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ)। তাঁদের মধ্যে একজন অর্থাৎ হযরত সাফিয়া (রাঃ) খায়বার বিজয়ের পর নবীর (সাঃ) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আর সর্বসম্মত মতে খায়বার বিজিত হয় ৭ম হিজরীতে। দ্বিতীয় মহিলা হযরত মারিয়াকে (রাঃ) মিসরের শাসক মুকাওকিস ৭ম হিজরী সনে নবীর (সাঃ) খেদমতের জন্য পাঠিয়েছিলেন। ৮ম হিজরীর যুলহাজ্জ মাসে তাঁরই গর্ভে নবীর (সাঃ) পুত্র সন্তান হযরত ইবরাহীম (রাঃ) জন্ম লাভ করেন। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে এ বিষয়টি প্রায় সুনির্দিষ্ট হয়ে যায় যে, এ সূরাটি ৭ম অথবা ৮ম হিজরীর কোন এক সময় নাযিল হয়েছিল।

✅সূরার সংক্ষিপ্ত শানে নু্যুল/প্রেক্ষাপট

সহীহ্ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করতেন এবং এই কারণে তিনি তার ঘরে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতেন। এই জন্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) পরস্পর পরামর্শ করেন যে, তাঁদের মধ্যে যাঁরই কাছে নবী (সঃ) আসবেন তিনি যেন তাকে বলেনঃ “আপনার মুখ হতে মাগাফীরের (গেঁদ বা আঠা জাতীয় জিনিস যাতে দুর্গন্ধ রয়েছে) গন্ধ আসছে, সম্ভবতঃ আপনি মাগাফীর খেয়েছেন!” সুতরাং তারা এ কথাই বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি যায়নাব (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনো আমি মধু পান করবো না। সুতরাং তোমরা এ কথা কাউকেও বলবে না।”
ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকে কিতাবুল ঈমান ওয়ান নুযূর-এর মধ্যেও কিছু বৃদ্ধি সহকারে আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এখানে দু'জন স্ত্রী দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর চুপে-চুপে কথা বলা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ‘আমি মধু পান করেছি' এই উক্তিটি। তিনি কিতাবুত তালাকের মধ্যে এ হাদীসটি আনয়ন করে বলেন যে, মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে।

কিতাবুত তালাকে এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই শব্দে বা ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট যেতেন এবং কাউকেও নিকটে করে নিতেন। একদা তিনি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং অন্যান্য দিন তাঁর কাছে যতক্ষণ অবস্থান করতেন, সেই দিন তদপেক্ষা বেশীক্ষণ অবস্থান করেন। এতে আমার মনে নিজের মর্যাদাবোধ জেগে উঠলো। তত্ত্ব নিয়ে জানলাম যে, তাঁর কওমের একটি স্ত্রীলোক এক মশক মধু তার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ঘরে এতোটা বিলম্ব করেছেন। আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা হতে ফিরিয়ে দিব। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ (রাঃ)-কে বললামঃ তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবেঃ “আজ কি আপনি মাগাফীর খেয়েছেন?” তিনি জবাবে বলবেনঃ “না।” তখন তুমি বলবেঃ তাহলে এই গন্ধ কিসের?” তিনি। তখন বলবেনঃ “হাফসা (রাঃ) মধু পান করিয়েছেন।” তুমি তখন বলবেঃ “সম্ভবতঃ মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কণ্ঠকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে।” আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া (রাঃ)! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।” হযরত সাওদাহ (রাঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার উপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি তাকে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বলে দিলাম। তারপর তিনি হযরত সফিয়া (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এরপর হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেনঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন বলতে লাগলেনঃ “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমি (আয়েশা রাঃ) বললামঃ চুপ থাকো।

সহীহ মুসলিমে এটুকু বেশী রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেনঃ “আপনি মাগাফীর খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফীরেও কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি। বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেনঃ “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফীর এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফীরের গন্ধ রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতে جَرَسَتْ শব্দ রয়েছে, জাওহারী (রঃ) যার অর্থ করেছেন اَكَلَتْ অর্থাৎ খেয়েছে। মৌমাছিকেও جَوَارِس বলা হয় এবং جَرْس হালকা শব্দকে বলা হয়। পাখী যখন চঞ্চু দ্বারা কোন খাদ্য খায় তখন তার চঞ্চুর শব্দ শোনা যায়, ঐ সময় আরবরা বলেঃ سَمِعْتُ جَرْسَ الطَّيْرِ অর্থাৎ “আমি পাখীর চঞ্চুর শব্দ শুনেছি।” একটি হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতীরা পাখীর হালকা ও মিষ্টি শব্দ শুনতে পাবে।” এখানেও আরবী جَرْس শব্দ রয়েছে।

আসমাঈ' (রঃ) যিনি হযরত শু'বা (রাঃ) -এর মজলিসে ছিলেন, বলেন যে, হযরত শু’বা جَرْس শব্দটি جَرْش অর্থাৎ شِيْن দ্বারা পড়েন। তখন হযরত আসমাঈ’ (রঃ) বলেন যে, ওটা شِيْن দ্বারা হবে। তখন হযরত শুবা (রঃ) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এটা আমার চেয়ে বেশী জানেন। এটাই সঠিক হবে। তোমরা এটা সংশোধন করে নাও।” এ ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মোটকথা, মধু পান করানোর ঘটনায় দু’টি নাম বর্ণিত আছে। একটি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নাম এবং অপরটি হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর নাম। এই ব্যাপারে যারা একমত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। তাহলে খুব সম্ভব ঘটনা দু'টো হবে। তবে এই দুজনের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, وَاِذْ اَسَرَّ النَّبِىُّ اِلٰى بَعْضِ اَزْوَاجِهٖ حَدِيْثًا আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ “ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন। যখন হাফসা (রাঃ) দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-এর সাথে মশগুল রয়েছেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানাবে না। আমি তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। তা এই যে, আমার ইন্তেকালের পর আমার খিলাফত হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পর তোমার আব্বা লাভ করবেন। কিন্তু হযরত হাফসা (রাঃ) এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানিয়ে দেন। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ খবর আপনার কাছে কে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি আপনার দিকে তাকাবো যে পর্যন্ত না আপনি মারিয়াহ (রাঃ)-কে আপনার উপর হারাম করবেন।” তখন তিনি হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-কে নিজের উপর হারাম করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা يٰاَيُّهَا النَّبِىُّ لِمَ تُحَرِّمُ ـ ـ ـ-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)]

✅সূরার মূল বিষয়বস্তু

১. হালাল হারামের ইখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর হাতে ; এমন কি স্বয়ং রাসূল(স:) এর হাতেও নয়।

২. কেউ হালাল জিনিসকে নিজের জন্য হারাম করে নিলেই তা হারাম হয়ে যায়না, আবার হারাম জিনিসকে নিজের জন্য হালাল করে নিলে হালাল হয়ে যায়না। অবশ্য কেউ তালাকের নিয়্যাতে স্ত্রীকে হারাম ঘোষণা করলে তালাক হয়ে যায় তেমনি দাসীকে আযাদ করার নিয়্যাতে হারাম ঘোষণা করলেও দাসী আযাদ হয়ে যায়। কিন্তু উক্ত সূরায় রাসূল(স:) তালাক/আযাদ করার নিয়্যাতে মারিয়াম(রা:) কে হারাম ঘোষণা করেন নি। তাই তার জন্য রাসূল(স:) কে কাফফারা আদায় করে পুনরায় দাসী মারিয়াম(রা:) কে গ্রহণ করতে হয়েছে(ইবনে আব্বাস(রা:), ইমাম শাফঈ(রহ:), ইমাম আহমাদ(রহ:))।

৩. আল্লাহ দুইজনের মধ্যে ৩য় জন। সুতরাং কোন কথাই আল্লাহর কাছে গোঁপন। তাই রাসূল(স:) বারন করা সত্ত্বেও যখন ওনার গোপনীয়তা প্রকাশ করা হল তখন আল্লাহ নবী(স:) কে ওহীর মাধ্যমে তা জানিয়ে দেন।

৪. নিজ পরিবারের মানুষকে সংশোধন এর ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে এই সূরায়। কারন আখিরাতে কেউ কারো পাপ বহন করবেনা। এমনকি পিতা মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান সবাই পালাবে যদি তারা জাহান্নামী/কাফির হয়।

৫. কিন্তু যারা খাঁটি তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে,পরিবারে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবে; তাদের পরিবারের যারা তাদের সঙ্গী হবে, আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামতের দিন নূর দ্বারা পরিচালিত করবেন এবং মুমিন ব্যক্তি মুমিন আত্মীয় স্বজনের নূর দ্বারা উপকৃত হবে। মুমিন পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী,ভাই-বোন, সন্তান সবাই জান্নাতে মিলিত হবে।

৬. খাঁটি তওবা দ্বারা আল্লাহ পূর্বের সকল মন্দ কাজ নেক আমল দ্বারা পরিবর্তন করে দেন; এমনকি পূর্বের সকল নেক আমল ও কবুল করা হয়।

৭. কাফির এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে এই সূরায় যদি তারা নিজ পরিবারের কেউ বা আত্মীয় স্বজন ও হয়।

৮. এই সূরার শেষে আল্লাহ কাফিরদের জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন দুজন নবীর স্ত্রীকে। নূহ(আ:) এবং লূত(আ:) এর স্ত্রীকে।

৯. এবং মুমিনদের জন্য উপস্থাপন করেছেন দুজন নারীকে যাদের একজন ছিলেন কুখ্যাত কাফির ফেরাউনের স্ত্রী। আর অন্যজন ছিলেন কুমারী(পুরুষের সংস্পর্শ ব্যতীত); নবী ঈসা(আ:) এর মা।

✅মূল আলোচ্য বিষয়

✔️আলোচ্য আয়াতগুলো হল সূরা আত তাহরীম এর ১০-১২ নং আয়াত।

ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا لِّلَّذِيْنَ كَفَرُوا امْرَاَتَ نُوْحٍ وَّامْرَاَتَ لُوْطٍ ؕ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحَيْنِ فَخَانَتٰهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللّٰهِ شَيْئًا وَّقِيْلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدّٰخِلِيْنَ

আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহ ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উপস্থিত করছেন; তারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সংকল্প পরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারলনা এবং তাদেরকে বলা হলঃ জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর।(সূরা আত তাহরীম:১০)

#ইবনে কাসীর থেকে সূরা আত তাহরীম এর ১০ নং আয়াতের তাফসীর :

এখানে আল্লাহ দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাচ্ছেন যে, কাফিরদের তাদের কুফরী সত্ত্বেও মুসলমানদের সাথে দুনিয়ায় মিলে মিশে থাকা কিয়ামতের দিন কোনই উপকারে আসবে না। যেমন দুই জন নবী, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীদ্বয়, যারা সদা-সর্বদা এই নবীদের সাহচর্যে থাকতো, তাঁদের সাথে সব সময় উঠা বসা করতো, এক সাথে পানাহার করতো এবং এক সাথে রাত্রি যাপনও করতো, কিন্তু যেহেতু তাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, বরং তারা কুফরীর উপর কায়েম ছিল, সেই হেতু নবীদের অষ্ট প্রহরের সাহচর্য তাদের কোন কাজে আসলো না। নবীগণ তাদের পারলৌকিক কোন উপকার করতে পারলেন না এবং তাদেরকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করতে সক্ষম হলেন না। বরং তাদেরকেও জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো।

এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এখানে খিয়ানত দ্বারা ব্যভিচার উদ্দেশ্য নয়। নবীদের (আঃ) পবিত্রতা ও সততা এতো ঊর্ধ্বে যে, তাদের স্ত্রীদের মধ্যে ব্যভিচাররূপ জঘন্য পাপকার্য প্রকাশ পাওয়া সম্ভব হতে পারে না। আমরা সূরায়ে নূরের তাফসীরে এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি। বরং এখানেও উদ্দেশ্য দ্বীনের ব্যাপারে খিয়ানত করা। অর্থাৎ তারা দ্বীনের ব্যাপারে তাদের স্বামীদের খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। দ্বীনের কাজে তাদের সঙ্গিনী হয়নি।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ব্যভিচার ছিল না। বরং এই ছিল যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী বলতো যে, এই লোকটি অর্থাৎ হযরত নূহ (আঃ) একজন পাগল। আর হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা এই ছিল যে, তাঁর বাড়ীতে কোন মেহমান আসলে সে কাফিরদেরকে খবর দিয়ে দিতো। হযরত নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী তাঁর গোপন তথ্য এবং গোপনে ঈমান আনয়নকারীদের নাম কাফিরদের কাছে প্রকাশ করে দিতো। অনুরূপভাবে হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীও তার স্বামী হযরত লূত (আঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতো এবং যাঁরা মেহমানরূপে তাঁর বাড়ীতে আসতেন তাঁদের খবর তার কওমকে দিয়ে দিতো, যাদের কু-কাজের অভ্যাস ছিল।

✔️তারপর সূরা আত তাহরীম এর ১১ নং আয়াত

وَضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوا امْرَاَتَ فِرْعَوْنَ ۘ اِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِيْ عِنْدَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِيْ مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهٖ وَنَجِّنِيْ مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِيْنَ ۙ

আল্লাহ বিশ্বাসীদের জন্য উপস্থিত করেছেন ফির‘আউন পত্নীর দৃষ্টান্ত, যে প্রার্থনা করেছিলঃ হে আমার রাব্ব! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করুন এবং আমাকে উদ্ধার করুন ফির‘আউন ও তার দুস্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।(সূরা আত তাহরীম:১১)

সূরা আত তাহরীম এর ১২ নং আয়াত

وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرٰنَ الَّتِيْۤ اَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيْهِ مِنْ رُّوْحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمٰتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهٖ وَكَانَتْ مِنَ الْقٰنِتِيْنَ

আরও দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন ইমরান তনয়া মারইয়ামের, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার রবের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছিল; সে ছিল অনুগতদের একজন।(সূরা আত তাহরীম:১২)

#ইবনে কাসীর থেকে ১১-১২ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের জন্যে দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেনঃ যদি মুসলমানরা প্রয়োজনবোধে কাফিরদের সাথে মিলে মিশে থাকে তবে তাদের কোন অপরাধ হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

لَا یَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُوْنَ الْكٰفِرِیْنَ اَوْلِیَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِیْنَ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِكَ فَلَیْسَ مِنَ اللّٰهِ فِیْ شَیْءٍ اِلَّاۤ اَنْ تَتَّقُوْا مِنْهُمْ تُقٰىةً

অর্থাৎ “মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮)

হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, সারা জগতের লোকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উদ্ধত লোক ছিল ফিরাউন। কিন্তু তার কুফরীও তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। কেননা, তার স্ত্রী তাঁর যবরদস্ত ঈমানের উপর পূর্ণমাত্রায় কায়েম ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করেন না।

হযরত সালমান (রঃ) বলেন যে, ফিরাউন ঐ সতী-সাধ্বী নারীর উপর সর্বপ্রকারের নির্যাতন করতো। কঠিন গরমের সময় তাকে রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে দিতো। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ ফেরেশতাদের পরের দ্বারা তাঁকে ছায়া করতেন এবং তাঁকে গরমের কষ্ট হতে রক্ষা করতেন। এমন কি তিনি তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দিতেন। ফলে তাঁর রূহ তাযা হয়ে উঠতে এবং ঈমান বৃদ্ধি পেতো। তিনি ফিরাউন ও হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকতেন যে, জয়লাভ কে করলো? সব সময় তিনি শুনতে পেতেন যে, হযরত মূসাই (আঃ) জয়লাভ করেছেন। তখন ওটাই তাঁর ঈমান আনয়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি ঘোষণা করেনঃ ‘আমি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ)-এর প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।”

ফিরাউন এ খবর জানতে পেরে তার লোকজনকে বললোঃ সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোঁজ করে নিয়ে এসো। অতঃপর তাকে চিত করে শুইয়ে দাও এবং তাকে বললোঃ “তুমি তোমার এই আকীদা হতে বিরত থাকো। যদি বিরত থাকে তবে ভাল কথা, সে আমার স্ত্রী। তাকে মর্যাদা সহকারে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। আর যদি না মানে তবে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে এবং তার মাংস টুকরো টুকরো করে ফেলবে। অতঃপর তার লোকেরা পাথর নিয়ে আসলো এবং তাঁকে নিয়ে গেল ও চিত করে শুইয়ে দিলো এবং তাঁর উপর ঐ পাথর নিক্ষেপ করার জন্যে উঠালো। ঐ সময় তিনি আকাশের দিকে তার চক্ষু উঠালেন। মহান আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দিলেন এবং তিনি জান্নাত এবং সেখানে তাঁর জন্যে যে ঘর তৈরী করা হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখে নিলেন। ওতেই তাঁর রূহ বেরিয়ে পড়লো। যখন পাথর তার উপর নিক্ষেপ করা হয় তখন তার মধ্যে রূহ ছিলই না। তিনি শাহাদাতের সময় দু'আ করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক। 'আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। তাঁর দু'আর সূক্ষ্মতার প্রতি লক্ষ্য করা যাক, প্রথমে তিনি আল্লাহর সন্নিধান কামনা করছেন, তারপর ঘরের প্রার্থনা করছেন। এই ঘটনার বর্ণনায় মারফূ’ হাদীসও এসেছে। তারপর তিনি দুআ করছেনঃ “আমাকে উদ্ধার করুন ফিরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।”

ঐ পুণ্যবতী মহিলার নাম ছিল, আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)। তার ঈমান আনয়নের ঘটনাটি হযরত আবূল আলিয়া নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ

ফিরাউনের দারোগার স্ত্রীর ঈমান ছিল হযরত আসিয়ার (রাঃ) ঈমান আনয়নের কারণ। দারোগার স্ত্রী একদা ফিরাউনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে চিরুণী তার হাত হতে পড়ে যায়। তখন তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়ঃ “কাফিররা ধ্বংস হোক।” ফিরাউনের কন্যা তার মুখে একথা শুনে বললোঃ “তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে স্বীকার কর?" মহিলাটি উত্তরে বলল “আমার, তোমার পিতার এবং অন্যান্য সবারই প্রতিপালক হলেন আল্লাহ।" সে তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে মহিলাটিকে খুবই মারপিট করলো। অতঃপর তার পিতাকে এ খবর দিয়ে দিলো। ফিরাউন মহিলাটিকে ডেকে নিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি আমার ছাড়া আর কারো ইবাদত কর?” মহিলাটি জবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হলেন, আল্লাহ। আমি তাঁরই ইবাদত করি।” একথা শুনে ফিরাউন তার লোকদেরকে হুকুম করলোঃ “মহিলাটিকে চিৎ করে শুইয়ে দাও। তার হাতে পায়ে পেরেক মেরে দাও আর সাপ ছেড়ে দাও যে তাকে কামড়াতে থাকবে।” মহিলাটি এই অবস্থাতেই থাকেন। আবার একদিন ফিরাউন তার কাছে এসে বললোঃ “এখনো কি তোমার চিন্তার পরিবর্তন হয়নি। পুনরায় তিনি জবাব দিলেনঃ “তোমার আমার এবং সব জিনিসের প্রতিপালক হলেন একমাত্র আল্লাহ।” ফিরাউন বললোঃ “আচ্ছা, এখন আমি তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছি। সুতরাং এখনো তোমাকে বলছিঃ আমার কথা মেনে নাও এবং তোমার এই দ্বীন হতে ফিরে এসো।” মহিলাটি উত্তর দিলেনঃ “তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।” ঐ অত্যাচারী তখন তাঁর পুত্রকে ধরে আনতে বললো এবং তার সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ যখন বের হয় তখন সে বললোঃ “মা! তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আল্লাহ তোমার জন্যে বড় বড় পুণ্য রেখেছেন এবং তুমি অমুক অমুক নিয়ামত লাভ করবে।” মহিলাটি তাঁর ছেলের রূহ এভাবে বের হতে স্বচক্ষে দেখলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং আল্লাহ পাকের ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। ফিরাউন আবার তাঁকে বেধে ফেলে রাখলো এবং সাপ ছেড়ে দিলো। পুনরায় একদিন এসে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো। মহিলাটি এবারও অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে একই জবাব দিলেন। ফিরাউন তাকে আবার ঐ হুমুকই দিলো এবং তাঁর আরেকটি ছেলে ধরে এনে তার চোখের সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ অনুরূপভাবেই তার মাতাকে সুসংবাদ দিলো এবং তাকে ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করলো।

ফিরাউনের স্ত্রী এই মহিলাটির বড় ছেলের রূহের সুসংবাদ শুনেছিলেন। এই ছোট ছেলেটিরও সুসংবাদ শুনলেন। সুতরাং তিনিও ঈমান আনয়ন করলেন। ওদিকে ঐ মহিলাটির রূহ আল্লাহ তা'আলা কবয করে নিলেন এবং তাঁর মনযিল ও মরতবা যা আল্লাহ তা’আলার নিকট ছিল তা পর্দা সরিয়ে ফিরাউনের স্ত্রীকে দেখিয়ে দেয়া হলো। সুতরাং তার ঈমান বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউনের কানেও তাঁর ঈমানের কথা পৌঁছে গেল। সে একদা তার সভাষদবর্গকে বললোঃ “তোমরা আমার স্ত্রীর কোন খবর রাখো কি? তোমরা তাকে কিরূপ মনে কর?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই তাঁর খুব প্রশংসা করলো এবং তার গুণাবলীর বর্ণনা দিলো। ফিরাউন তখন তাদেরকে বললোঃ “না, না, তোমরা তার খবর রাখে না। সে আমি ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে মেনে থাকে।” তারপর তাদের মধ্যে পরামর্শ হলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে। অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরে শুইয়ে দেয়া হলো। ঐ সময় তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দুআ কবুল করেন এবং পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দেন। তা দেখে তিনি হেসে ওঠেন। ঠিক ঐ সময়েই তাঁর কাছে ফিরাউন এসে পড়ে এবং তাঁকে হাসির অবস্থায় দেখতে পায়। তখন সে তার লোকজনকে বলেঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা কি বিস্ময়বোধ করছে না যে, এরূপ কঠিন শাস্তির অবস্থাতেও এ মহিলা হাসতে রয়েছে? নিশ্চয়ই এর মাথা খারাপ হয়েছে।” মোটকথা ঐ শাস্তিতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।

এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন। তা হলো হযরত মরিয়ম বিনতে ইমরানের (আঃ) দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতী-সাধ্বী রমণী। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আমার ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।

আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈলকে মানুষের রূপ দিয়ে হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন এবং তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন তার মুখ দিয়ে মরিয়ম (আঃ)-এর জামার ফাঁকে ফুঁকে দেন। তাতেই তিনি গর্ভবতী হয়ে যান এবং হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।

এরপর মহান আল্লাহ হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর আরো প্রশংসা করে বলেনঃ সে তাঁর প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাব সত্যি বলে গ্রহণ করেছিল, সে ছিল অনুগতদের একজন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাটিতে চারটি রেখা টানেন এবং সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এগুলো কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, জান্নাতী রমণীদের মধ্যে চারজন হলো সর্বোত্তম। তাঁরা হলো খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ), ফাতেমা বিনতু মুহাম্মাদ (সঃ) (রাঃ), মরিয়ম বিনতু ইমরান (আঃ) এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)।” (এ হাদসীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “পুরুষ লোকদের মধ্যে তো পূর্ণতাপ্রাপ্ত লোক বহু রয়েছে। কিন্তু রমণীদের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্তা রমণী রয়েছে শুধুমাত্র ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ), মরিয়ম বিন্তু ইমরান (আঃ) ও খাদীজা বিন্তু খুওয়াইলিদ (রাঃ)। আর সমস্ত রমণীর মতো আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত এমনই যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে সারীদ মাদক খাদ্যের ফযীলত।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)

আমরা আমাদের কিতাব আল বিদাইয়াহ্ ওয়ান নিহাইয়াহ এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় এই হাদীসের সনদ ও শব্দসমূহ বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আর আল্লাহ তা'আলার ফযল ও করমে এই সূরারই আয়াতের শব্দ ثَيِّبَاتٍ وَّاَبْكَارًا-এর তাফসীরের মধ্যে ঐ হাদীসটির বর্ণনা করে দিয়েছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত আসিয়া বিন্তু মাযাহিম (রাঃ)-ও একজন।

✅ আলোচ্য আয়াত থেকে শিক্ষা

উক্ত ৩ টি আয়াত থেকে ২ টি প্রধান শিক্ষা

১. প্রত্যেকেই নিজ আমল অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবেনা। নবীর স্ত্রী হলেই মুক্তি পাওয়ার আশা নেই যদিনা সে মুমিন নারী হয়। তেমনি স্ত্রী ঈমানদার হলেই স্বামীর মুক্তি পাওয়ার কোন আশা নেই যদিনা স্বামী মুমিন পুরুষ হয়। মুমিন হওয়ার পর একজনের সুপারিশ আরেকজনের কাজে আসতে পারে কিয়ামতের দিন যদি আল্লাহ ইচ্ছা পোষণ করেন।

২. ঈমানী দায়িত্ব হল নিজের পরিবারের মানুষজনকে সর্বাগ্রে হিদায়াতের নাসীহা দেয়া। তবে এটাও বিশ্বাস করতে হবে হিদায়াতের মালিক আল্লাহ। সকল প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ঈমানদার নারীর স্বামী বদকার হতে পারে। তেমনি ঈমানদার পুরুষের স্ত্রীও বদকার নারী হতে পারে সকল প্রচেষ্টার পরেও। তাই প্রচেষ্টার পাশাপাশি দুয়া চালিয়ে যেতে হবে।

Reference source: Quran App: Quran.gtaf.org

Share
f𝕏W✉

Send a Comment

Your comment will be sent privately to the MCC Newsletter team and will not be published on the website.

Source note: Verify every Qur’anic verse and translation.

Back to September issue

About this contribution

The submitted text is retained in its original language and sequence. Personal contact details are excluded.

© Muslim Circle of Canada ·