দারসূল কুরআন
সূরা আল আসর
সূরা নংঃ১০৩
আয়াতঃ০৩
নাযিলের স্থানঃ মাক্কী
শব্দ সংখ্যাঃ১৪
🔰সূচিপত্র
১.নামকরন,নাযিলের সময়,স্থান
২.নাযিলের প্রেক্ষাপট /শানে নুযুল
৩.মূল বিষয়বস্তু
৪.অর্থ,ব্যাখ্যা/তাফসীর
৫.শিক্ষা এবং উপকারিতা
কীওয়ার্ড: সময়, ক্ষতি, ঈমান, নেক আমল/সৎকাজ, হকের উপদেশ, সবরের উপদেশ
🔰আরবী,অর্থ,ব্যাখ্যা,তাফসীর
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيم
১. وَٱلْعَصْرِ
অর্থ: সময়ের [মহাকালের/যুগের] শপথ
২. إِنَّ ٱلْإِنسَٰنَ لَفِى خُسْرٍ
অর্থ: নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত;
৩. إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلْحَقِّ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلصَّبْرِ
অর্থ: তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং একে অপরকে সত্যের তাগিদ দেয় ও সবরের তাগিদ দেয়।
ইমাম শাফিঈ (র.) বলেছেন, আল্লাহ যদি এই সূরাটি ছাড়া আর কিছুই নাযিল না করতেন, তাহলেও তা মানুষের জন্য যথেষ্ট হতো। চিন্তা-গবেষণা করে এই একটি সূরা অনুধাবন করলে মানুষের আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় না। [ইবনে কাসীর]
আব্দুল্লাহ ইবনু হিসন ইবনু মাদীনাহ বলেন:রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের মধ্যে দু ব্যক্তি ছিলেন, তারা পরষ্পর সূরা আসর পাঠ করে না শুনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতেন না।(তাবারানী,বাইহাকী)
ইমাম শাফেয়ী আরো বলেন,لو ما أنزل الله حجة على خلقه إلا هذه السورة لكفتهم
অর্থাৎ,আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজীবের উপর প্রমাণসরূপ শুধু এ সূরা অবতীর্ণ করলে তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।(তাফসীরুল ইমাম আশ শাফেয়ী)
✅প্রথম আয়াতঃ
وَالْعَصْرِ - সময়ের শপথ।
🚩আসর (عَصْرِ) শব্দটি "ع ص ر" মূল থেকে এসেছে - যার অর্থ হচ্ছে চেপে ধরা, চাপ দেয়া, নিংড়ানো ইত্যাদি। এই অর্থের কারণে আসর (عَصْرِ) শব্দটি সেই সময়ের সাথে সম্পর্কিত যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে বা দ্রুত বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে; কিংবা সময়ের বহমানতা যা একটি সমাপ্তির নিকটবর্তী; শেষ বিকেল।
🚩আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মহাকালের শপথ অর্থাৎ কালের দুর্যোগপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের শপথ।
🚩ইবনে কাসীর বলেন, "আসর" হলো কাল বা সময় যাতে মানুষ ন্যায়-অন্যায় কাজ করে থাকে।
🚩ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন,'আসর'অর্থ কাল।(কুরতুবী)।
🚩এখানে কালের শপথ করা হয়েছে,যার মধ্যে মানুষদের ভাল-মন্দ সকল কাজ সম্পাদিত হয়।(ইবনে কাসীর)।
কালের মাঝে সকল বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে বলে একে 'বিস্ময়ের কেন্দ্র'(أبو العجب)বলা হয়।
আয়াতের প্রথমেই সময় বা যুগের কসম করা হয়েছে।কারণ হলো:
🚩অধিবাংশ তাফসীরবিদ বলেন,মানুষের সকল কর্ম,চলাফেরা ইত্যাদি সব যুগের মধ্যে সংঘটিত হয়।সূরায় যেসব কর্মের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেগুলোও যুগেরই দিবা-রাত্রিতে সংঘটিত হবে,এজন্যই কালের শপথ করা হয়েছে।(সাদী,ইবনে কাসীর)।
🚩আল্লাহর মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব,প্রজ্ঞাও কুদরতের নিদর্শন সময় বা যুগেই রয়েছে;সেকারণেই সময়ের শপথ করা হয়েছে।(মুয়াস্সার,বাদায়ি'উত তাফসীর)।
এখানে কালের সপথ বিশেষ অর্থপূর্ণ।কারণ,যুগের পরিবর্তন হবে,কিন্তু অতীত,বর্তমান,ভবিষ্যৎ সর্বকালে আয়াতটি একই গুরুত্ব বহন করবে।
🚩শাইখ তানতাভী জাওহারী বলেন, পবিত্র কুরআনে ৪০ টি বিষয়ের শপথ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ২০ টি ভূমন্ডলীয় ও২০টি নভোমন্ডলীয়।আর আসর তথা কালের শপথ সর্বশেষ শপথ এবং নভোমন্ডল সম্পর্কিত।(তাফসীর তানতাভী)।
মানবজীবনে সময়ের গুরুত্ব অত্যাধিক।কেননা আল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যতীত কসম করেন না।
✅দ্বিতীয় আয়াতঃ
إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ — অতি নিশ্চিতভাবে মানুষ ক্ষতিতে নিমজ্জিত -
🚩إِنَّ — অর্থ নিশ্চয়ই।
🚩الْإِنسَانَ — অর্থ মানুষ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এখানে মানুষ অর্থ কাফের।
🚩 لَفِي خُسْرٍ — এখানে "ফী খুসরিন" অর্থ ক্ষতির মধ্যে কবরস্থ এবং চারদিক থেকে ক্ষতি ঘিরে রেখেছে। আয়াতের শুরুতে "ইন্না" [নিশ্চয়ই] জোর দেওয়ার জন্য ব্যবহার হয়েছে। "ফী"-র আগে "লাম" শব্দাংশটিও জোর দেওয়ার জন্যই ব্যবহার হয়েছে।[তাফসীরে ফখরুদ্দীন আল রাজি]
এটি পূর্ববর্তী শপথের জওয়াব।
🚩আরবী خاسر অর্থ, লাভের বিপরীত।আবার ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে পুঁজিহীন দেউলিয়ার ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়।(ফাতহুল কাদীর)।
আয়াতটিতে মানুষ বলতে সমগ্র মানবজাতিই উদ্দেশ্য।
আয়াতটিতে (إن الإنسان لخاسر)অর্থাৎ,(সকল সানুষ ক্ষতিগ্রস্ত) না বলে لفي خسر (অবশ্যই ক্ষতির মাঝে নিমজ্জিত)বলে একথা বুঝানো হয়েছে যে,নিশ্চয়ই মানুষ চারদিক থেকে আসা ক্ষতির মাঝে ডুবে আছে।
🚩এছাড়াও মানুষের স্বভাবগত ক্ষতপ্রবণতা ও ইচ্ছা-অনিচ্ছায় প্রতিনিয়ত ক্ষতির মাঝে নিপতিত হওয়ার বিষয়টা জোড়ালো করতে خسر তথা ক্ষতি শব্দকে নাকিরাহ করে ব্যাপকতার অর্থে নেয়া হয়েছে,এবং প্রথম দুটি আয়াতে কসমসহ তিনটি তাকিদ আনা হয়েছে।(তাফসীরুল কুরআন)।
এই আয়াত ব্যতীতও পবিত্র কুরআনে আরও কয়েক শ্রেণীর ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে।তারা হলো:
👉শিরককারী (যুমার-৬৫)।
👉আল্লাহর সাক্ষাত অস্বীকারকারী(আন'আম-৩১)।
👉ক্বিয়ামতের দিন যার সংকর্মের পাল্লা হালকা হবে('আরাফ-৯)।
👉শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণকারী(নিসা-১১৯)।
👉শয়তানের দল(মুজাদালা-১৯)।
👉ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের অনুসারী(ইমরান-৮৫)।
👉নড়বড়ে আক্বীদার দু-মনা ব্যক্তি যে লাভের শর্তে ঈমান আনে(হাজ্জ-১১)।
👉পিতা-মাতার অবাধ্য+পুণরুত্থান অস্বীকারকারী(আহকাফ-১৮)।(তাওযীহুল কুরআন)।
👉বলুন, আমরা কি তোমাদেরকে কর্মের দিক দিয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্তদের খবর দিব? এরা তারাই পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, যদিও তারা মনে করে যে, তারা তাদের কাজের দ্বারা ভালো কিছু অর্জন করছে। তারাই সে লোক, যারা তাদের পালনকর্তার নিদর্শনগুলো ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয়কে অস্বীকার করে, ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন আমি তাদের [কর্মগুলোকে] কোনো ওজন দিব না। জাহান্নামই তাদের প্রতিফল। [১৮: ১০৩-১০৬]
👉যারা আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। [৩৯: ৬৩]
👉নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা কিয়ামতের দিন নিজেদের ও নিজেদের পরিবারবর্গের ক্ষতি করবে। জেনে রাখ, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি। [৩৯: ১৫]
তাই এই আয়াতের "ইনসান"-কে ইবনে আব্বাস [রা.] কর্তৃক "কাফের" হিসেবে তাফসীর করা যথার্থ হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস [রা.] "ক্ষতি"-র তাফসীরে বলেছেন, মানুষ ক্ষতির মধ্যে এবং জান্নাতে তার জন্য নির্ধারিত বাসস্থান ও তার পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শাস্তির মধ্যে।
অর্থাৎ আল্লাহ দুনিয়ার জীবনের ক্ষতি বলতে "কুফর" ও "শিরক" করার দ্বারা আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তথা জাহান্নামী হওয়াকে বুঝিয়েছেন।
দুনিয়ার শান্তি ও কল্যান থেকে বঞ্চিত হওয়াও দুনিয়ার ক্ষতি
✅৩য় আয়াতঃ
إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلْحَقِّ وَتَوَاصَوْا۟ بِٱلصَّبْرِ
অর্থ: তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং একে অপরকে সত্যের তাগিদ দেয় ও সবরের তাগিদ দেয়।
এ গুণাবলীর প্রথম দুটি আত্মসংশোধন সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয় দুটি বিষয় অপর মুসলিমের হেদায়াত ও সয়শোধন সম্পর্কিত(সাদী)।
প্রথম দুটি ব্যক্তিগত ও পরের দুটি সমাগত।এর দ্বারা মানুষের লুক্কায়িত জ্ঞানশক্তি ও কর্মশক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।(তাফসীরুল কুরআন)।
এই সূরার দৃষ্টিতে ক্ষতিমুক্ত থাকতে হলে চারটি গুণসম্পন্ন হতে হবে:
১.ঈমান আনা
২.সৎকর্ম করা
৩.হকের উপদেশ দেয়া
৪.সবরের উপদেশ দেয়া
💟ঈমানঃ
"ঈমান" (إِيمَان ) অর্থ বিশ্বাস। শরীয়াতের পরিভাষায়, মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যে কিতাব পেয়েছেন তাতে এবং মহানবী (সা.) যে পথ দেখিয়েছেন তাতে আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতির নাম ঈমান।
🚩ঈমান অর্থ স্বীকৃতি দেয়া।শরীয়তের পরিভাষায়:অন্তরে বিশ্বাস,মুখে স্বীকৃতি এবং কাজে বাস্তবায়নকে ঈমান বলে।[মাজমূ ফাতওয়া৭/৬৩৮]
🚩ঈমানের ভিত্তি ছয়টি।যেমন হাদীসে জিব্রীলে এসেছে:
(الإيمان أن تؤمن بالله و ملاءكته و كتبه ورسله واليوم الآخر و تؤمن بالقدر خيره و شره).
অর্থাৎ,১|আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস,২|ফেরেশতাগণের উপর বিশ্বাস,৩| আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস,৪| রাসূলগণের উপর বিশ্বাস,৫| বিচার দিবস এবং৬|ভাগ্যের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস।(সহীহ মুসলিম)।
🚩ঈমান আনতে হবে বিশুদ্ধ জ্ঞান ও দলিলের ভিত্তিতে।জ্ঞান ঈমানের এমন শাখা যা ব্যতীত ঈমান পরিপূর্ণ হয় না।(বিন বায)।
🚩মূলত সর্বাগ্রে ঈমান সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতে হবে।এর দলীলস্বরুপ ইমাম বুখারী 'কথা ও কাজের পূর্বে জ্ঞান অর্জন'অনুচ্ছেদ রচনা করে দলীল এনেছেন"তুমি জ্ঞান অর্জন কর এ বিষয়ে যে,আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন উপাস্য নেই"(মুহাম্মাদ-১৯)।
💟সৎকর্মঃ
🚩সৎকর্ম [صَلْحَة] বলতে সেসব কাজকে বোঝায় যেগুলোকে শরীয়াত সৎকর্ম বলে নির্দেশ করেছে। [তাফসীরে মাজহারী, ইবনে কাসীর]
🚩ইবনে কাসীর (র.) বলেন, আল্লাহর কিতাব ও রাসূল [সা.]-এর সুন্নাহ অনুযায়ী করা কাজ হলো সৎকর্ম।
🚩আবু জাফর তাবারী (র.)-এর মতে, সৎকর্ম হলো আল্লাহর নির্দেশিত ফরয কাজগুলো সম্পাদন করা এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা।
🚩 وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ — এবং একে অপরকে সত্যের তাগিদ দেয়
"তাওয়াসও" (تَوَاصَوْ) এসেছে "তাওয়াসী" (تواصي) থেকে যার অর্থ একে অপরকে আদেশ/উপদেশ দেয়া। [মুফরাদাত]
🚩"তাওয়াসী" শব্দটির মূলে আছে "ওয়াসিয়াত" (وصیت) — যার অর্থ বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে উপদেশ দেওয়া ও সৎকাজের জোর তাকীদ করার নাম "ওয়াসিয়াত"। [মারেফুল কুরআন]
🚩সৎকর্ম কবুল হওয়ার শর্ত তিনটি:১-বিশুদ্ধ আক্বীদা,২-কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক হওয়া,৩-নিয়ত বিশুদ্ধ থাকা।(বিন বায)।
আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ আল-খাতমী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ প্রতিটি সৎকাজ একটি সাদাকা(দানস্বরূপ) (আবু দাউদ)।
আবূ যার্র (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমাদের কেউ এমন অবস্থায় সকালে ওঠে যে, তার (দেহের) প্রতিটি জোড়ের সাদকা দেওয়ার জন্য সে দায়বদ্ধ হয়। সুতরাং প্রত্যেক ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা সাদকাস্বরূপ, প্রত্যেক ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা সাদকাস্বরূপ, প্রত্যেক ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা সাদকাস্বরূপ, প্রতিটি ‘আল্লাহু আকবার’ বলা সাদকাস্বরূপ, সৎকাজের আদেশ দেওয়া সাদকাস্বরূপ এবং মন্দকাজে বাধা দেওয়া সাদকাস্বরূপ। আর এ সমস্ত কিছুর পরিবর্তে দু’ রাকআত (চাশ্তের) নামায পড়লে তা যথেষ্ট হবে।” (মুসলিম ১৭০৪নং)
আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: প্রতিদিন সকালে আদম সন্তানের দেহের প্রতিটি জোড়ার জন্য সদাক্বাহ ধার্য হয়। তার সঙ্গে সাক্ষাতকারীকে তার সালাম দেয়া একটি সদাক্বাহ। সৎকাজ আদেশ করা একটি সদাক্বাহ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করাও একটি সদাক্বাহ। রাস্তা হতে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলা একটি সদাক্বাহ। নিজ স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করাও একটি সদাক্বাহ। সাহাবীরা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে কামভাব উপভোগ করলে তাও কি তার জন্য সদাক্বাহ? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তা অবৈধ পাত্রে রাখা হলে কি সে গুনাহগার হতো না? তিনি আরো বললেনঃ দুপুরের সময় দুই রাক’আত সলাত আদায় করা এসবের জন্য যথেষ্ট। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, হাম্মাদ (রাঃ) ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ’ কথাটুকু উল্লেখ করেননি।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫২৪৩
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ,
💟হকের উপদেশঃ
"হক্ব" শব্দের অর্থ সত্য, সঠিক, সমতা, অধিকার ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনে "হক্ব" বলতে আল্লাহর নাযিলকৃত বাণীকে বোঝানো হয়েছে:
🚩"আপনার রবের পক্ষ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, তা সত্য।" [১৩: ১]
🚩"হক্ব আপনার রবের পক্ষ থেকে আগত।" [৩: ৬০, ২: ১২৯, ১৮: ২৯]
এই আয়াতে "হক্ব" বলতে আল্লাহর কিতাবকে বুঝিয়েছে—এই মত দিয়েছেন হাসান বসরী, কাতাদাহ (র.)। অর্থাৎ তারা কুরআন থেকে উপদেশ দেয়।
হক শব্দের কয়েকটি অর্থ বর্ণিত হয়েছে।
🚩ইবনে আব্বাসের মতে,ঈমান ও তাওহীদ(বাগাভী,কুরতুবী)।
🚩কাতাদা বলেন,কুরআন(কুরতুবী)।
🚩সুদ্দী বলেন, আল্লাহকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে(কুরতুবী)।
🚩শরীয়ত নির্দেশিত কাজ করা ও নিষিদ্ধ কাজ পরিহার করা(ইবনে কাসীর)।
🚩ঈমান ও সৎকর্মের প্রতি উপদেশ(বিন বায)।
🚩ফরয আদায় ও মন্দ পরিহার
আর তোমরা একযোগে আল্লাহর রজ্জু সুদৃঢ় রূপে ধারণ কর ও বিভক্ত হয়ে যেওনা, এবং তোমাদের প্রতি আল্লাহর যে দান রয়েছে তা স্মরণ কর।
(সূরা আল ইমরান:১০৩)
এবং তোমাদের মধ্যে এরূপ এক সম্প্রদায় হওয়া উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহবান করে এবং সৎ কাজে আদেশ করে ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, আর তারাই সুফল প্রাপ্ত হবে।(সূরা আল ইমরানের ১০৪)
তোমরাই সর্বোত্তম উম্মাত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে; আর যদি গ্রন্থ প্রাপ্তরা বিশ্বাস স্থাপন করত তাহলে অবশ্যই তাদের জন্য মঙ্গল হত; তাদের মধ্যে কেহ কেহ মু’মিন এবং তাদের অধিকাংশই দুস্কার্যকারী।(সূরা আল ইমরানের ১১০)
আর মু’মিন পুরুষরা ও মু’মিনা নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের বন্ধু। তারা সৎ কাজের শিক্ষা দেয় এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করে, আর সালাতের পাবন্দী করে ও যাকাত প্রদান করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ মেনে চলে, এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই করুণা বর্ষণ করবেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, হিকমাতওয়ালা।
(সূরা তওবা:৭১)
অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ তা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর।
(সূরা আল হিজর:৯৫)
"সৎ কাজ করতে ও সংযমী হতে তোমরা পরস্পরকে সাহায্য কর। তবে পাপ ও শক্রতার ব্যাপারে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করনা। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।" (সূরা মায়িদা:২)
তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহবান কর হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে কথা বল সুন্দরভাবে। তোমার রাব্ব ভাল করেই জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী এবং কে সৎ পথে আছে।(সূরা আন নাহল:১২৫)
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” (আহমাদ ১১০৭৪, মুসলিম ১৮৬, আসহাবে সুনান)
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।” (আবূ দাঊদ ৪৩৪৬, তিরমিযী ২১৭৪, ইবনে মাজাহ ৪০১১)
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি (কাউকে) সৎপথের দিকে আহবান করবে, সে তার প্রতি আমলকারীদের সমান নেকী পাবে। এটা তাদের নেকীসমূহ থেকে কিছুই কম করবে না। আর যে ব্যক্তি (কাউকে) ভ্রষ্টতার দিকে আহবান করবে, তার উপর তার সমস্ত অনুসারীদের গোনাহ চাপবে। এটা তাদের গোনাহ থেকে কিছুই কম করবে না।” (মুসলিম ৬৯৮০)
অর্থাৎ,
★আল্লাহর দিকে আহব্বান করা
★কুরআন সুন্নাহর দিকে আহবান করা
★সৎকাজের আদেশ দেয়া
★অসৎকাজে বাধা দেয়া
★হালালের দিকে আহবান করা
★হারাম থেকে বিরত রাখা বা বাধা দেয়া
💟সবরের উপদেশঃ
وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ — এবং একে অপরকে সবরের তাগিদ দেয়
সবর (صَبْرٌ) শব্দটি এসেছে ص ب ر মূল থেকে, যার অর্থ বেঁধে ফেলা, বিরত রাখা, বন্ধ করা ইত্যাদি। উৎসগতভাবে সবর (صَبْرٌ) অর্থ প্রবৃত্তিকে তার আসক্তি ও যথেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখা। [তাফসীরে তাবারী, ১ম খণ্ড]
ইসলামী শারীয়াতে সবর (صَبْرٌ)-এর বিষয়টিকে ঈমান ও আমলের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ইমাম দায়লামি (রহ.)-এর "মুসনাদ আল ফিরদাউস" গ্রন্থে ও ইমাম ইবন আবিদ্দুনইয়া (রহ.)-এর "আস-সবরু ওয়াস সওয়াব" গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসে এসেছে, মহানবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
" الصَّبْرُ ثَلَاثٌ: فَصَبْرٌ عَلَى الْمُصِيبَةِ، وَصَبْرٌ عَلَى الطَّاعَةِ، وَصَبْرٌ عَنِ الْمَعْصِيَةِ،"
- “সবর তিন প্রকার:
১.বিপদের সময়ে সবর,
২.[আল্লাহর] আনুগত্যের ক্ষেত্রে সবর এবং
৩.[আল্লাহর] অবাধ্যতা না করার ক্ষেত্রে সবর।”
হাদীসটির বর্ণনার সনদে দুর্বলতা থাকলেও সকল মুফাসসীরই সবর (صَبْرٌ) শব্দের ব্যাখ্যায় অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের "সবর"-এর তাফসীরে বলেছেন: ধৈর্যের সাথে উপদেশ দেয় আল্লাহর ফরযসমূহ আদায় করতে ও পাপ থেকে বিরত থাকতে এবং উপদেশ দেয় বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করতে।
মুফাসসীর আল্লামা ইবন কাসীর (রহ.)-এর ব্যাখ্যা মতে, সবর তিন প্রকার: ১. হারাম ও পাপকাজ বর্জনের সবর ২. ইবাদাত ও নৈকট্যলাভের কাজ করার সবর ৩. বিপদে সবর। [তাফসীরে ইবন কাসীর, ২য় খণ্ড]
অর্থাৎ সব ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট মনে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচলভাবে সক্রিয় থাকার নামই সবর (صَبْرٌ)।
অর্থাৎ
হারাম ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে সবরের উপদেশ দেয়া
আল্লাহর আনুগত্য ও নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে সবরের উপদেশ দেয়া
বিপদ আপদ, দু:খ, কষ্ট, ঈমানী পরীক্ষায় সবরের উপদেশ দেয়া
⚠️ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত
দোতলা জাহাজের উদাহরণ
নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী (সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে বাধাদানকারী) এবং ঐ সীমা লংঘনকারী (উক্ত কাজে তোষামোদকারীর) উপমা হল এক সম্প্রদায়ের মত; যারা একটি দ্বিতলবিশিষ্ট পানি জাহাজ লটারি করে কিছু লোক উপর তলায় এবং কিছু লোক নিচের তলায় স্থান নিল। (নিচের তলা সাধারণতঃ পানির ভিতরে ডুবে থাকে। তাই পানির প্রয়োজন হলে নিচের তলার লোকদেরকে উপর তলায় যেতে হয় এবং সেখান হতে সমুদ্র বা নদীর পানি তুলে আনতে হয়।) সুতরাং পানির প্রয়োজনে নিচের তলার লোকেরা উপর তলায় যেতে লাগল। (উপর তলার লোকদের উপর পানি পড়লে তারা তাদের উপর ভাগে আসা অপছন্দ করল। তারা বলেই দিল, ‘তোমরা নিচে থেকে আমাদেরকে কষ্ট দিতে এসো না।’)
নিচের তলার লোকেরা বলল, ‘আমরা যদি আমাদের ভাগে (নিচের তলায় কোন স্থানে) ছিদ্র করে দই, তাহলে (দিব্যি আমরা পানি ব্যবহার করতে পারব) আর উপর তলার লোকদেরকে কষ্টও দেব না। (এই পরিকল্পনার পর তারা যখন ছিদ্র করতে শুরু করল) তখন যদি উপর তলার লোকেরা তাদেরকে নিজ ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয় (এবং সে কাজে বাধা না দেয়), তাহলে সকলেই (পানিতে ডুবে) ধ্বংস হয়ে যায়। (উপর তলার লোকেরা সে অন্যায় না করলেও রেহাই পেয়ে যাবে না।) পক্ষান্তরে উপর তলার লোকেরা যদি তাদের হাত ধরে জাহাজ ছিদ্র করতে) বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বেঁচে যায় এবং সকলকেই বাঁচিয়ে নেয়।’’(বুখারী,তিরমিজি, আহমাদ)
(রিয়াদুস সলেহিন, হাদিস নং ১৯২)
বনী ঈসরায়েলদের উদাহরণ
‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ বনী ইসরাঈলের মধ্যে সর্বপ্রথম ত্রুটি ঢুকেছে এভাবে যে, তাদের কেউ অপরজনের সাক্ষাতে বলতো, এই যে! তুমি আল্লাহ্কে ভয় করো এবং যা অপকর্ম করছো, তা পরিত্যাগ করো। কেননা এগুলো করা তোমার জন্য বৈধ নয়। পরের দিন আবার তার সঙ্গে সাক্ষাত হলে তার অপকর্ম তার সঙ্গে একত্রে পানাহার ও মেলামেশা করতে তাকে বিরত রাখতো না। যখন তাদের অবস্থা এরুপ হলো, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে পরস্পরের সাথে একাকার করে দিলেন। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ “বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা দাঊদ ও মারইয়াম পুত্র ঈসা কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল…. ফাসিকূন” পর্যন্ত (সূরাহ আল-মায়িদাহঃ ৭৮-৮১)। পুনরায় তিনি বলেনঃ কখনো নয়, আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই সৎকাজেরআদেশ দিবে এবং মন্দ কাজে বাধা দিবে এবং অবশ্যই অত্যাচারির দুই হাত ধরে তাকে সৎপথে ফিরে আসতে ও সত্যের উপর অবিচল থাকতে বাধ্য করবে।
(মিশকাত,সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৩৩৬)
হাদিসের মান: দুর্বল হাদিস
★কেউ হয়ত খুব পরহেজগার। কিন্তু তার বন্ধু ঘুষ খায়। একদিন দুইদিন সতর্ক করার পর এক সময় সেও থেমে যায় এবং বন্ধুর সাথে গলায় গলায় সম্পর্ক । একসময় দেখা যাবে ভাইয়ের ঘুষ খাওয়াকেও সে বিভিন্ন ফতোয়া দিয়ে হালাল করে নিচ্ছে। এবং একসময় সেও এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
★ বন্ধু হয়ত হারাম বিজনেস করছে। মনে মনে অপছন্দ করলেও বন্ধুর সাথে উঠা বসা বন্ধ করবেনা। একসময় সেই বন্ধুর ফাঁদে পা দিয়ে নিজেও হারাম বিজনেসে জড়িয়ে যায়।
⛔শনিবার দিনের কাহিনি(আয়লার বানরগুলো)
সূরা আল বাকারা:৬৫
সূরা আল আরাফ:১৬৩-১৬৬
তিনটি দল ছিল।
-প্রথম দল শনিবারের দিনের আইন ভঙ্গ করে মাছ জালে/গর্তে আটকয়ে রবিবারে ধরে খেত।
-দ্বিতীয় দল তাদেরকে নিষেধ করত
-তৃতীয় দল মনে মনে ঘৃনা করত, কিন্তু অপরাধীদেরকে নিষেধ করতনা, চুপ থাকত। উলটো নিষেধকারীদেরকে বলত,"তাদেরকে বলে লাভ নেই। তারাতো শাস্তির উপযুক্ত। যেকোনো সময় তাদের উপর আল্লাহর গজব আসবে!"
ইবনে আব্বাস(রা:) ও অনেক মুফাসসিরের এর বর্ননা মতে, পরিশেষে আল্লাহ পাক দ্বিতীয় দল ছাড়া বাকি দুই দলকে বানরে পরিনত করে ধ্বংস করে দেন।
আর ইকরিমা(রহ:) সহ অন্যান্য মুফাসসিরদের মতে, " শুধুমাত্র প্রথম দলকেই আল্লাহ পাক বানরে পরিনত করে ধ্বংস করে দেন!"
পরবর্তীতে ইবনে আব্বাস(রা:) ওনার মত থেকে সরে এসে ইকরিমা(রহ:) এর মত সমর্থন করেন।
মোটকথা, শুধুমাত্র যারা নিষেধ করত মন্দ কাজে তারাই নিশ্চিতভাবে বেঁচে যায় এবং যারা মন্দ কাজ করত তারা নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যায়,এই ব্যাপারে সকল মুফাসসিরগন একমত। শুধুমাত্র যারা নিরপেক্ষ ছিল তাদের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। তাদের ক্ষেত্রে সন্দেহ থেকে যায়। সুতরাং আল্লাহর গজব থেকে নিশ্চিতভাবে পরিত্রাণ পেতে হলে সেইফ সাইড হল মন্দ কাজে সরাসরি হাতে বা মুখে বাধা দেয়া। আর মনে মনে ঘৃনা করলেও বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।কিন্তু মনে মনে ঘৃনা না করে উলটো সমর্থন করলে বা একেবারেই নিরপেক্ষ থাকলে পরিনতি প্রথম দলের মতই হবে নিশ্চিত।
🔥ধ্বংস অনিবার্য
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ্ তা’আলা শীঘ্রঈ তোমাদের উপর তাঁর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তাঁর নিকট দু’আ করলেও তিনি তোমাদের সেই দু’আ গ্রহন করবেন না।
সহীহ্, সহীহাহ (২৮৬৮), বুখারী, মুসলিম।
জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২১৬৯
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ।
খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর এর দাওয়াহর একটা বইতে এসেছে,
কারো যদি অসৎকাজে বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকে তাহলে সে তা প্রয়োগ না করলে শাস্তির যোগ্য হবে এবং এই হাদিসের আওতাভুক্ত হবে। যদি তার হাত দিয়ে বাধা দেয়ার সামর্থ্য থাকে তবে তাই করতে হবে;যদি তার মুখ দিয়ে বারন করার সামর্থ্য থাকে তবে তাই করতে হবে;যদি তাও না থাকে তবে মন থেকে ঘৃনা করে যেতে হবে।
তিনি বলেছেন, আবার নিজের অধীনস্তদেরকে সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা ফরজ(কারন প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের জবাব্দিহিতা দিতে হবে)। এখন সে নিজে মানুক বা না মানুক। নিজে না মেনে উপদেশ দিলেও পরিনতি খারাপ হবে। আবার নিজে মানিনা বলে উপদেশ না দিলেও পরিনতি খারাপ হবে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে জাহান্নাম থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল নিজে মেনে অধীনস্তদেরকে হকের উপদেশ দেয়া।
যেমন, কোন বাবা নিজে নামাজ পড়েনা যদিও তার উপর নামাজ পড়া ফরজ ;কিন্তু সন্তানকে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেয়া তার জন্য ফরজ। নামাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া তার জন্য ফরজ। এখন নিজে না পড়ে সন্তানকে নির্দেশ দিলে একটা শাস্তি থেকে বাঁচবে ;কিন্তু আরো দুইটা শাস্তি অবধারিত। এক,নিজের উপর ফরজ হওয়া সত্ত্বেও সেটা অমান্য করল। দুই.নিজে যা মানেনা তা সন্তানকে নির্দেশ দিল। আবার নির্দেশ না দিলেও একটা শাস্তি থেকে বাঁচবে। সেটা হল নিজে না করে অন্যকে উপদেশ দেয়ার শাস্তি। কিন্তু এখানেও দুটি শাস্তি বরাদ্দ থাকবে। এক.নিজে নামাজ পড়লনা। দুই.সন্তানকেও নির্দেশ দিলনা। সুতরাং সম্পূর্নভাবে বাঁচতে হলে তাকে নিজেকেও নামাজ পড়তে হবে এবং সন্তানকেও নির্দেশ দিতে হবে।
আবার একটা অসৎকাজ হচ্ছে দেখেও উপস্থিত সবার মধ্যে কেউই যদি বিরোধিতা না করে বা বাধা না দেয় তবে প্রত্যেকেই শাস্তির উপযুক্ত হবে। কিন্তু যেকেউ একজন বা কয়েকজন সেই কাজটি করলে অন্যরা বেঁচে যাবে। এভাবে সমাজের কেউই যদি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধের কাজ না করে তবে ঐ জনপদে আল্লাহ পাক গজব পাঠান।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই কাজটি সামাজিকভাবে ফরজ বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক। কখনো ফরজ কখনো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ পাক প্রত্যেককেই কারো না কারো দায়িত্বশীল করেছেন কিংবা প্রত্যেকের অধীনেই কেউনা কেউ আছে। সে হিশেবে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের উপরই এই কাজটি করা ফরজ। এক্ষেত্রে শুধু পরিবারের দায়িত্বশীল নয়,,সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের উপরেও এটা ফরজ। ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,সর্বস্তরের শিক্ষিক,বিজনেসের মালিক, চেয়ারম্যান, মেম্বার, দলনেতা,মন্ত্রী মিনিষ্টার প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কারো অধীনে একজন মানুষ থাকলেও তার উপর এই দায়িত্ব আছে।
✂️নিজে আমল না করে অন্যকে হকের উপদেশ দেয়ার শাস্তি
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা:) এর কাছে এক ব্যক্তি এসে আরজ করল যে সে দ্বীনের প্রচার করতে চায়, দাওয়াতী কাজ করতে চায়। তখন তিনি তাকে এই তিনটি আয়াতের উপর আমল করছে কিনা জিজ্ঞেস করলে উত্তরে লোকটি বলে, না করেনি। এরপর ইবনে আব্বাস(রা:) বলেন, তাহলে তুমি দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত না। আগে এই তিনটি আয়াত আমল শুরু কর, তারপর দাওয়াতী কাজ কর।
অর্থাৎ তুমি যেদিকে মানুষকে আহবান করবে আগে সেটা নিজে বাস্তবায়ন করবে। এই গুনটি অর্জন কর।নিজে আমল না করে অন্যকে নাসীহা দেবেনা।
আয়াত তিনটি হল:
তোমরা কি লোকদেরকে সৎ কাজে আদেশ করছ এবং তোমাদের নিজেদের সম্বন্ধে বিস্মৃত হচ্ছ? অথচ তোমরা গ্রন্থ পাঠ কর; তাহলে কি তোমরা হৃদয়ঙ্গম করছনা?(সূরা আল বাকারা:৪৪)
হে মু’মিনগণ! তোমরা যা করনা তা তোমরা কেন বল?তোমরা যা করনা তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।
(সূরা আস সফ:২-৩ )
শুয়াইব(আ:) কে তার জাতি(মাদইয়ানবাসী) ওজনে কম দেয়ার মত খারাপ কাজগুলোর প্রতি আহবান করলে জবাবে তিনি বলেন,"
"আর আমি এটা চাইনা যে, আমি তোমাদের বিপরীত সেই সব কাজ করি যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি; আমিতো সংশোধন করে দিতে চাচ্ছি, যে পর্যন্ত আমার সাধ্যে হয়, আর আমার যা কিছু প্রচেষ্টা তা শুধু আল্লাহরই সাহায্যে হয়ে থাকে; আমি তাঁরই উপর ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি।(সূরা হুদ:৮৮)
আবূ যায়দ উসামাহ ইবনে যায়দ ইবনে হারেষাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, “কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারিপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা তার চাকির চারিপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামীরা তার কাছে একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, ‘ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না (আমাদেরকে) সৎ কাজের আদেশ, আর অসৎ কাজে বাধা দান করতে?’ সে বলবে, ‘অবশ্যই। আমি (তোমাদেরকে) সৎকাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি তা নিজে করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দান করতাম; অথচ আমি নিজেই তা করতাম!” (বুখারী ৩২৬৭, মুসলিম ৭৬৭৪)
হাদিস সম্ভার, হাদিস নং ১৬১৮
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ,
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “আমি মি’রাজের রাতে এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছি যারা আগুনের কাঁচি দ্বারা নিজেদের ঠোঁট কাটছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে জিবরীল! ওরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘ওরা আপনার উম্মতের বক্তাদল; যারা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিত, অথচ ওরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন করত, তবে কি ওরা বুঝত না।” (আহমাদ ১২২১১, ১২৮৫৬ প্রভৃতি, ইবনে হিব্বান ৫৩, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ২৮৩২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭৭৩, আবূ য়্যা’লা ৩৯৯২, সহীহ তারগীব ১২৫)
হাদিস সম্ভার, হাদিস নং ১৬১৯
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ,
আবূ বারযাহ আসলামী (রাঃ) ও জুন্দুব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি লোকেদেরকে ভালো শিক্ষা দেয় এবং নিজেকে ভুলে বসে সেই ব্যক্তির উদাহরণ একটি (প্রদীপের) পলিতার মত; যে লোকেদেরকে আলো দান করে, কিন্তু নিজেকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে!” (বাযযার, সহীহ তারগীব ১৩০)
হাদিস সম্ভার, হাদিস নং ১৬২০
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ
🔰সূরার শিক্ষা এবং করনীয়
সুতরাং এই সূরার সারমর্ম হলো, মানুষ জাহান্নামী [ক্ষতিগ্রস্ত] হওয়া থেকে বাঁচতে হলে চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে -
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.০-এর ওপর ঈমান আনা
২. শরীয়াত অনুযায়ী কর্ম করা
৩. অন্যকে কুরআনের উপদেশ দেওয়া
৪. সব ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহর আনুগত্যে মনকে স্থির রাখা।
এর যেকোনো একটিও বাদ গেলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারন এখানে প্রতিটি কাজের আগে ওয়া শব্দটি এসেছে। ওয়া মানে এবং। যদি এবং না হয়ে অথবা হত তাহলে অন্য কোন অপশন থাকত। কিন্তু এখন এই চারটি কাজ একইসাথে না করলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার নূন্যতম মার্কস ও পাওয়া যাবেনা।
ঈমানবিহীন কোন ভাল কাজ সৎকাজ হিসেবে বিবেচিত হবেনা।
ঈমান আনার পর সেসব কাজ ই সৎকাজ হিসেবে বিবেচিত হবে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্যেশ্যে হয়, কুরআনের হুকুম অনুযায়ী হয় এবং রাসূল(স:) এর দেখানো নির্দেশিত পথে হয়
ঈমান আনলাম, নেক আমল ও করলাম ; কিন্তু অন্যদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান করলাম না,কুরআনের দিকে আহবান করলাম না, সৎকাজের আদেশ দিলাম না, অসৎকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখলাম না, কুরআন দিয়ে বিচার ইনসাফ করলাম না…..তাহলেও ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায় নেই।
ঈমান আনলাম, নেক আমল করলাম, হকের উপদেশ ও দিলাম; কিন্তু অন্যকে সবরের উপদেশ বা পরামর্শ দিলাম না, তাকে ঈমানের পথে সবরের সাথে টিকে থাকতে সাহায্য করলাম না, তার বিপদ আপদে পাশে থাকলাম না, শান্তনা দিলাম না, জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম না;শুধু মুখে মুখে দাওয়াত দিয়েই তাকে কঠিন পরিস্থিতিতে একাকী ছেড়ে দিলাম, তার সাহায্যে এগিয়ে গেলাম না, তার উপর জুলুম হচ্ছে দেখেও চুপ থাকলাম। তাহলেও আমি ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবোনা।
ঈমান আনলাম; কিন্তু নিজে নেক আমল না করে অন্যকে হকের উপদেশ দিলাম। পরিনাম অত্যন্ত ভয়াবহ। জাহান্নামে কাঁচি দিয়ে জিহব্বা কাটা হবে এবং পেটের নাড়ি ভুড়ি বের করে দৌড়াতে হবে।
সুতরাং ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে এ চারটির প্রতিটি কাজ ই করতে হবে।
আল্লাহ সুবহানু-ওয়া-তায়ালা আমাদের সকলকে সূরা আসরের আলোকে জীবন গঠন করার তৌফিক দিক এবং খাঁটি তওবা করার তঊফিক দান করুন!আমিন!

Send a Comment
Your comment will be sent privately to the MCC Newsletter team and will not be published on the website.