↑SC
MCC logo
MCC Newsletter
August 2026
HomeBack to August issueContribute

Hadith reflection

দারসুল হাদিস

By Farzana Yeasmin

Share
f𝕏W✉

🔰দারসুল হাদিস

حَدَّثَنَا الْحُمَيْدِيُّ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ الأَنْصَارِيُّ، قَالَ أَخْبَرَنِي مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيُّ، أَنَّهُ سَمِعَ عَلْقَمَةَ بْنَ وَقَّاصٍ اللَّيْثِيَّ، يَقُولُ سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ ـ رضى الله عنه ـ عَلَى الْمِنْبَرِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ "‏ إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ

‘আলক্বামাহ ইব্‌নু ওয়াক্কাস আল-লায়সী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
আমি ‘উমর ইব্‌নুল খাত্তাব (রাঃ)-কে মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছিঃ কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে- তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে, যে জন্যে, সে হিজরত করেছে।

(সহিহ বুখারী,সহীহ মুসলিম)

✅রাবী/বর্ননাকারীর পরিচয়

হাদিসটির রাবী অর্থাৎ বর্ননাকারী হলেন খুলাফায়ে রাশেদীনের দ্বিতীয় খলীফা "হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) " যিনি ছিলেন অর্ধ পৃথিবীর শাসক।তাঁর মূল নাম ছিল "উমার"। উপনাম " আবু হাফস"।অর্থাৎ তিনি ছিলেন রাসূল(সাঃ) এর স্ত্রী হাফসা(রাঃ) এর পিতা।তাঁর উপাধী ছিল "আল ফারুখ"।" আল ফারুখ " অর্থ সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী।রাসূল(সঃ) তাকে এই উপাধী দেন।কারন তিনি ইসলাম গ্রহনের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত প্রচ্ছন্নভাবে চলছিল কুরাইশদের নির্যাতনের ভয়ে।কিন্তু উনি ইসলাম গ্রহনের পর থেকেই প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াহ এর কাজ শুরু হয় এবং তিনি ছিলেন কাফেরদের জন্য ত্রাস সৃষ্টি কারী।তিনিই একমাত্র সাহাবী যার কারনে প্রথম সত্য(ইসলাম/কুরআন) এবং মিথ্যা(কুফুরী) এর মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য সৃষ্টি হয়।তাঁর পিতার নাম ছিল খাত্তাব।মাতার নাম ছিল হানতামাহ বিনতি হাশিম ইবনি মুগীরাহ।তারা উভয়েই ছিল কুরাইশ বংশের।৫৮৩ খৃষ্টাব্দে তাঁর জন্ম।রাসূল(সঃ) এর চেয়ে তিনি ১৩ বছরের ছোট ছিলেন।হিজরতের সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর।ইসলাম গ্রহনের পূর্বে তিনি ছিলেন ইসলামের ঘোরবিরোধী শত্রু। কিন্তু রাসূল(সাঃ) এর দোয়ায় এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি ইসলাম গ্রহনের পর হয়ে গেলেন মুমিন দের প্রতি কোমল এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর ত্রাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তি ।হযরত উমার সব সময় হাতে একটি দুররা বা ছড়ি হাতে নিয়ে ঘুরতেন।শয়তান ও তাঁকে দেখে পালিয়ে যেত।তাই বলে তিনি অত্যাচারী ছিলেন না।তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ন শাসক।ইসলামের প্রথম খলীফাহ আবু বকর (রাঃ) এর ইন্তেকালের পর তিনি হিজরী ১৩ সালের জুমাদাল আখিরাহ মাসে খিলাফাতের দায়িত্ব পালন করেন।রাসূল (সাঃ) তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন,"আমার পরে যদি কেউ নবী হত,তবে তা হত উমার ইবনে খাত্তাব(রাঃ)"।কারন তাঁর মধ্যে ছিল নবী-রাসূল দের বৈশিষ্ট্য। তাঁর শাসনামলে মোট ১০৩৬ টি শহর বিজিত হয়।তিনিই প্রথম খলীফা যিনি "আমিরুল মুমিনীন" উপাধী লাভ করেন।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) তাঁর সম্পর্কে বলেন,"উমারের ইসলাম গ্রহম ইসলামের বিজয়,তাঁর হিজরত আল্লাহর সাহায্য এবং তার খেলাফত আল্লাহর রহমত!"

তিনি রাসূল(সঃ) এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) এর শাসনামলে মন্ত্রী এবং উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।সেজন্য বাহিরের কাজে প্রচুর সময় ব্যয় করত কারনে রাসূল(সঃ) এর সাহাচর্যে থেকে খুব বেশি হাদিস মুখস্ত,বর্ননা এবং সংরক্ষন করতে পারেন নি।তাঁর বর্নিত হাদিসের সংখ্যা ৫৩৯ টি।সহিহুল বুখারীতে এককভাবে ৯ টি এবং সহীহুল মুসলিমে এককভাবে ১৫ টি হাদিস বর্নিত হয়েছে।তবে তিনি হাদিস সংগ্রহ,লিপিবদ্ধ এবং শিক্ষাদান প্রসারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অবদান রেখেছেন তাঁর শাসনামলে।

প্রায় দীর্ঘ সাড়ে দশ বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রখ্যাত সাহাবী মুগীরা ইবন শু'বার(রাঃ) এর অগ্নি উপাসক দাস আবু লু'লু ফিরোজ এর হাতে ফজরের নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার তিন দিনে হিজরী ২৩ সনের ২৭ জিলহজ্জ্ব বুধবার তিনি ইন্তেকাল করেন।মৃতুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।তাঁর খেলাফতকাল ছিল দশ বছর ছয় মাস চার দিন।

✅হাদিসগ্রন্থের পরিচয়

হাদিসটি সিহাহ সিত্তাহর ৬ টি বিশুদ্ধ গ্রন্থের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধতম এবং শ্রেষ্ঠ গ্রন্থদ্বয় বুখারী এবং মুসলিম শরীফে একই রাবী থেকে বর্নিত হয়েছে।বিশেষজ্ঞ আলেমগন "বুখারী" শরীফ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন," আসমানের নিচে এবং জমিনের উপরে আল কুরআনের পর যদি কোন বিশুদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে থাকে তবে তা হল বুখারী শরীফ।বুখারী শরীফের পরেই মুসলিম শরীফের স্থান।

✅হাদিসটির প্রেক্ষাপট/পটভূমি

এই হাদিসটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্নিত হয়েছে।রাসূল(সঃ) এর নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পর যখন প্রকাশ্যে দাওয়াত দান শুরু হয় তখন মক্কার অভিজাত বংশের কিছু কাফির মুশরিক সে কাজে বাধা দান করা শুরু করে,নির্যাতন ও করা শুরু করে।তখন রাসূল(সঃ) তাঁর বিশিষ্ট সাহাবীদেরকে নিয়ে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন এবং অন্যান্য ইসলাম গ্রহনকারীদেরকেও হিজরতের নির্দেশ দেন।তাদের মধ্যে উম্মে কায়েস বা কায়লা নামের এক সুন্দরী মহিলা ছিল যে মদীনায় হিজরত করে। একজন পুরুষ সে মহিলাকে বিয়ে করার উদ্যেশ্যে মদীনায় হিজরত করে।ফলে ঐ লোকের মনের বাসনা আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূল(সঃ) জানতে পারেন এবং লোকদেরকে তাদের মনের বাসনা/নিয়ত সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য সবাইকে জড়ো করে উক্ত হাদিসটি বর্ননা করেন।মূলত,লোকটি আপাত দৃষ্টিতে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেও শুধুমাত্র নিয়তের তারতম্যের কারনে তার হিজরত আল্লাহর দরবারের তাঁর সন্তুষ্টি এবং রাসূল (সঃ) এর নির্দেশ মোতাবেক কবুল হয়নি।সে শুধু উক্ত মহিলাকেও হয়ত দুনিয়াতে স্ত্রী হিসেবে পাবে।কিন্তু হিজরতের মত এত কষ্টদায়ক নেকি অর্জনের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে শুধুমাত্র নিয়তের তারতম্যের কারনে।

✅মূল বক্তব্য/আলোচ্য বিষয়

হাদিসটিতে যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব আলকপাত করা হয়েছে।এই হাদিসের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে হাদিসটিকে অনেক আলেম ইসলাম সম্পর্কিত ইলমের এক-তৃতীয়াংশ হিসেবে গন্য করেছেন।বুখারী শরীফ এই হাদিস দিয়ে শুরু হয়েছে।আমীরুল মুমিনীন 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এই হাদিস দিয়ে ভাষন শুরু করতেন।নিয়্যতকে ইসলামী জীবন বিধানের মূল ফর্মূলা হিসেবে গন্য করা হয়।মানুষ যে নিয়িতে কাজ করবে তার ফল ও ঠিক সে নিয়িতেই বর্তাবে।কেউ দুনিয়া ফায়দার উদ্যেশ্যে কাজ করলে সে শুধু দুনিয়াই পাবে।আর কেউ পরকালীন ফায়দার উদ্যেশ্যে,আল্লাহ এবং তার রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্যেশ্যে কাজ করলে সে তাই পাবে।ইসলামী শরীয়াহ বিধানের ক্ষেত্রে নিয়তের দিকে লক্ষ্য রেখেই পুরষ্কার বা শাস্তি নির্ধারিত হবে।ইসলামী শরীয়াহ এর যেকোনো ইবাদাত ই হতে হবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্যেশ্যে এবং রাসূল(সঃ) এর দেখানো পদ্ধতিতে।তবেই সেটা সৎকাজ বা নেক আমল হিসেবে গন্য হবে।সূরা আল বাইয়্যিনাহ এর ৮ নং আয়াতে এসেছে,

"আর তাদেরকে হুকুম করা হয়েছে যে,তারা যেন একনিষ্ঠ হয়ে আন্তরিকভাবে(ইখলাস) আল্লাহর দ্বীন পালনের মাধ্যমে একমাত্র তারই ইবাদাত করে।" (সূরা আল বাইয়্যেনাহঃ৮)

যারা দ্বীনকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্যেশ্যে পালন করবে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন তাদেরকে তার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন এবং পুরষ্কৃত করবেন। সুরা আন নিসার ১৪৬ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহুতা'য়ালা আরো বলেন,

"তবে তাদের মধ্যে যারা তওবা করবে,নিজেদের কার্যাবলী সংশোধন করে নেবে,আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে ধারন করবে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিজেদের দ্বীনকে(ইসলামী বিধান) খালেস করে নেবে তারা ঐসব লোক যারা মু'মিনদের সাথেই রয়েছে।আল্লাহ মুমিনদেরকে অবশ্যই বিরাট পুরষ্কার দেবেন।" (সূরা আন-নিসাঃ১৪৬)

কারো কাজ আল্লাহর নিকট গৃহীত হওয়ার জন্য এবং তদুনাযায়ী পুরষ্কৃত হওয়ার জন্য তিনি কখনই বান্দার দুনিয়াবী সফলতা,সম্পদ,চাকচিক্যময়তা,দৈহিক সৌন্দর্য,আভিজাত্য দেখেন না।তিনি দেখেন শুধু বান্দার অন্তরের অন্তস্থলের লালিত ইচ্ছা,আকাঙ্ক্ষা বা নিয়্যাত।

"আবু হুরাইরা(রাঃ) থেকে বর্নিত,তিনি বলেনঃরাসূল(সঃ) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবয়ব এবং ধন সম্পদের দিকে তাকান না;বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং বাস্তব কর্মের দিকে তাকান।(মুসলিম শরীফ)

অর্থাৎ বান্দার কোন কাজ ইবাদাত বা সৎকাজ হিসেবে তখনই গন্য হবে যখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে হবে এবং রাসূল(সঃ) এর দেখানো পদ্ধতিতে হবে।শুধুমাত্র নিয়্যাতের তারতম্যের কারনে কোন বান্দার সারাজীবনের আমল বরবাদ হয়ে যেতে পারে। তাই শরীয়াহর বিধান আমল করার পূর্বেও নিয়্যাত সম্পর্কে পর্যাপ্ত ইলম অর্জন করা জরুরি এবং নিয়্যাতের ব্যাপারে নিজের নফসকে বার বার যাচাই করা জরুরি যেন শয়তান সেখানে ভিন্ন কোন নিয়্যাতের প্রবেশ ঘটিয়ে পুরো আমল টাই বরবাদ না করে দেয়।ক্ষনস্থায়ী জীবনে মানুষের আয়ু ক্ষীন।এই স্বল্প আয়ুর জীবনে মুমিনের কোন কাজ ই যেন পন্ডশ্রম না হয় তাই প্রথমেই নিয়্যাতের ব্যাপারে হুঁশিয়ার করা হয়েছে উক্ত হাদিসে।

✅বিস্তারিত আলোচনা

১।নিয়্যাতের অর্থ এবং সংজ্ঞা

নিয়্যাতের আভিধানিক অর্থ হলো-ইচ্ছা,আকাঙ্ক্ষা, দৃড় সংকল্প ইত্যাদি।ইসলামী শরীয়াহ এর দৃষ্টিকোন থেকে নিয়্যাত হল-মহান আল্লাহর সন্তোষ লাভ ও তাঁর হুকুম পালনের উদ্যেশ্যে কোন কাজ করার দিকে হৃদয় মনের লক্ষ্য স্থির করা ও রাসুল(সঃ) এর দেখানো পদ্ধতিতে উদ্যোগ গ্রহন করাকে নিয়্যাত বলে।
আল্লামা খাত্তাবী (রহঃ) নিয়্যাতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেনঃ

" নিয়্যাত হল-তুমি তোমার মনে কোন কাজের সদিচ্ছা পোষন করবে এবং উহা বাস্তবায়নের জন্য প্রানপন চেষ্টা করবে।"

আল্লামা বাইদাবী (রহঃ) বলেনঃ"বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের কোন উপকার লাভ বা কোন ক্ষতি প্রতিরোধের উদ্যেশ্যে তার অনুকূল কাজের জন্য মনের যে উদ্যোগ তাকেই নিয়্যাত বলে।"

শরীয়াহভিত্তিক কাজে নিয়্যাতের ব্যাপারে ফতহুর রব্বানী গ্রন্থাকার বলেনঃ"আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং তার আদেশ পালনার্থে কোন কাজের দিকে মনের ঐকান্তিক আগ্রহ এবং অভিপ্রায় প্রয়োগ করা।"

নুরুল ইযা গ্রন্থাকার বলেনঃ"কাজের উপর মনের ইচ্ছা পোষন কে নিয়্যাত বলে।
অর্থাৎ, কোন কাজে করার জন্য মনের অভিপ্রায় বা দৃড় সংকল্প বা ইচ্ছাকে নিয়্যাত বলে।আর শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির ইচ্ছায় এবং পরকালীন পুরষ্কারের আশায় যেকোন কাজ যখন রাসূল(সঃ) এর সন্নাহ পদ্ধতিতে করা হয় তখন তা নেক কাজ হিসেবে বা ইবাদাত হিসেবে গন্য হবে এবং পরকালে তার পরিপুর্ন পুরষ্কার বরাদ্দ থাকবে,তার কাজ বিনষ্ট করা হবেনা।কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টীর ব্যতীত কোন নেক কাজ ই ইবাদাত হিসেবে গন্য হবেনা এবং আল্লাহর কাছে তার কোন পুরষ্কার থাকবেনা।

২।নিয়্যাতের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য

“কিন্তু মানবমন্ডলীর মধ্যে কেহ কেহ এরুপ আছে যারা বলেঃহে আমাদের রব্ব!আমাদেরকে ইহকালেই দান কর এবং তাদের জন্য আখিরাতে কোন অংশ নেই।“(সূরা আল বাকারাঃ২০০)
“আর তাদের মধ্যে কেহ কেহ বলেঃহে আমাদের রব্ব!আমাদেরকে ইহকালে দান করুন ও আখিরাতেও কল্যান দান করুন এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন।“(সূরা আল বাকারাঃ২০১)

এই দুয়াটি সহীহুল বুখারীতেও এসেছে।এটি দুনিয়া এবং আখিরাতে উভয় জগতে শান্তি এবং সফলতার জন্য শ্রেষ্ঠ দোয়া।আনাস(রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূল(সাঃ) অধিকাংশ সময় এই দুয়াটি করতেন।

দুনিয়া এবং আখিরাত,উভয় জাহানের সফলতা এবং কল্যানের প্রত্যাশা করা এবং সে অনুযায়ী চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শুধুমাত্র দুনিয়াবী কল্যানের উদ্যেশ্যে চেষ্টা করতে করতে কবর পর্যন্ত পৌঁছে গেলে তার জন্য আখিরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছুই বরাদ্দ থাকবেনা।

"দুনিয়া হল মুমিনের আখিরাতের শস্যক্ষেত্র!" (আল হাদিস)

অর্থাৎ দুনিয়ার কাজের মধ্য দিয়েই মুমিন বান্দা আখিরাতের ফলের ফসল ফলাবে।ফসল ফলাতে দুনিয়াতে,কিন্তু ফল ভোগ করবে আখিরাতে।
কিন্তু দুনিয়াতেও তার জন্য কল্যান এবং শান্তি বরাদ্দ থাকবে।
যেমনঃচক্ষুশীতলকারী এবং আনুগত্যপরায়ন স্ত্রী,সন্তান,পরিবার,বরকতময় হালাল ইনকাম,হালাল খাবার,সুমিষ্ট ইবাদাত,স্বলাত,সিজদা,সিয়াম,যাকাত প্রদান ইত্যাদি হল দুনিয়ার হাসানা।
এসবের মধ্য দিয়েই আবার পরকালীন কল্যান হাসিল করা সম্ভব।তাই জীবনে বেঁচে থাকার উপায় উপকরন হিসেবে ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হিসেবে গ্রহন করলে দুনিয়া এবং আখিরাতে উভয় জাহানেই শান্তি এবং কল্যান পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু আল্লাহর বিধান ত্যাগ করে জীবন ব্যবস্থা হিসেবে অন্য কোন জীবনবিধান গ্রহন করলে এবং সে অনুযায়ী চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলে তাকে দুনিয়াতেই সবকিছু দিয়ে দেয়া হবে,কিন্তু আখিরাতে কিছুই বরাদ্দ থাকবেনা।
এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের সূরা শু'রা এবং বনী ঈসরায়েলও এসেছে,
যে কেউ পরকালীন ফসল চায়, তার ফসল বৃদ্ধি করি। আর যে লোক দুনিয়ার ফসল চায় তাকে দুনিয়ায় হতে দান করি। কিন্তু পরকালের তার কিছুই প্রাপ্য হবে না। (সূরা আশ শুরা-২০)

যে ব্যক্তি দুনিয়ার নিয়ত রাখবে, আমি তাকে ইহজগতে যতটুকু ইচ্ছা প্রদান করব। অতঃপর তার জন্য দোযখ নির্ধারণ করব। সে এতে দুর্দশাগ্রস্ত বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আখেরাতের নিয়ত রাখবে এবং তার জন্য যেমন চেষ্টার প্রয়োজন তেমন চেষ্টাও করবে। যদি সে প্রকৃত মুমিন হয় এরূপ লোকদের চেষ্টা কবুল হবে। (সূরা বনী ইসরাইল-১৮-১৯)

বান্দার মৌলিক ইবাদাত(যেমনঃস্বলাত,সিয়াম,হজ্জ্ব,যাকাত,কুরবানী,জিহাদ ইত্যাদি) বা অন্যান্য যেকোনো ইবাদাত ই কবুল হওয়া নির্ভর করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে।প্রত্যেকেই তার নিয়তানুসারে ফলাফল পাবে। তাই প্রতিটি ইবাদাত করার আগে নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র নিয়্যাতের তারতম্যের কারনে বান্দার সারা জীবনের আমল বরবাদ হয়ে যেতে পারে।
নিয়ত সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, বলে দাও যেন প্রত্যেকেই নিজ নিজ নিয়ত অনুযায়ী কাজ করে। (বনী ইসরাইল-৮৪)

আল্লাহর কাছে কখনোও ওগুলির মাংস পৌঁছে না এবং রক্তও না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাক্ওয়া (সংযমশীলতা)। (সূরা হাজ্জ্ব ৩৭ আয়াত)

বল, তোমাদের মনে যা আছে তা যদি তোমরা গোপন রাখ কিংবা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা অবগত আছেন। (সূরা আলে ইমরান ২৯ আয়াত)

“অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর,যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে।”(সূরা মাঊন)

মুমিন আগুনে পুঁড়ে বা পাহাড় ধসে বা পানিতে পড়ে বা রোড এক্সিডেন্টে ইত্যাদি কিভাবে বা কি অবস্থায় মারা গেল তা বিবেচ্য বিষয় নয়।বিবেচ্য হল তার মৃত্যুবস্থায় জীবনের কোন নিয়্যাতের উপর মৃত্যু বরন করল এবং কোন কাজের জন্য সে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি কেউ তওবা করে ঈমান নবায়ন করার পর বা নতুন ঈমান আনার পর যদি এক ওয়াক্ত স্বলাত আদায় করার ও সুযোগ না পেয়ে মারা যায় তথাপিও সে নিয়্যাতের কারনে জান্নাতী হবে(রিয়াদুস স্বলেহীনে বর্নিত ১০১ জনকে হত্যা করার পর ঈমান এনে মৃত্যুবরন করা সেই ডাকাতের কাহিনী)। তাই সর্বাবস্থায় তওবা ইস্তেগফার করে নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করে নিতে হবে মৃত্যু আসার পূর্বেই।
ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোন জাতির উপর মহান আল্লাহ আযাব অবতীর্ণ করেন, তখন তাদের মধ্যে বিদ্যমান সমস্ত লোককে তা গ্রাস করে ফেলে। তারপর (বিচারের দিনে) তাদেরকে স্ব স্ব কৃতকর্মের ভিত্তিতে পুনরুত্থিত করা হবে।(বুখারী,মুসলিম)

আবূ বাকরাহ নুফাই বিন হারেস সাক্বাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন দু’জন মুসলিম তরবারি নিয়ে আপোসে লড়াই করে, তখন হত্যাকারী ও নিহত দু’জনই দোযখে যাবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! হত্যাকারীর দোযখে যাওয়া তো স্পষ্ট; কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কি? তিনি বললেন, সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য লালায়িত ছিল(নিয়তের কারণে)।(বুখারী,মুসলিম)

কোন নেক কাজের নিয়্যাত বিশুদ্ধ থাকলে সেই কাজটি করতে না পারলেও আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরষ্কার বরাদ্দ থাকবে।

আবূ আব্দুল্লাহ জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী (রাঃ) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এক অভিযানে ছিলাম। তিনি বললেন, মদীনাতে কিছু লোক এমন আছে যে, তোমরা যত সফর করছ এবং যে কোন উপত্যকা অতিক্রম করছ, তারা তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। অসুস্থতা তাদেরকে মদীনায় থাকতে বাধ্য করেছে। আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তারা নেকীতে তোমাদের অংশীদার(নিয়তের কারনে)।(মুসলিম)

হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বলেন, আমার বান্দা কোন গুনাহের কাজ করার নিয়ত করলে তা না করা পর্যন্ত তার জন্য কোন গুনাহ লিপিবদ্ধ করো না। তবে সে যদি গুনাহের কাজটি করে ফেলে, তাহলে কাজটির অনুপাতে তার গুনাহ লিখ। আর যদি আমার কারণে তা পরিত্যাগ করে তাহলে তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ করো। সে যদি কোন নেকীর কাজ করার জন্য ইচ্ছা বা নিয়ত করে কিন্তু এখনও তা করেনি তাহলে তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ করো।আর যদি কাজটি সে করে তাহলে তার জন্য দশগুণ থেকে (আন্তরিকতা অনুপাতে) সাতশ গুণ পর্যন্ত নেকী লিপিবদ্ধ করো। (সহীহ বুখারী)

অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিকভাবে নিয়্যাত শুদ্ধ হলেও পরে শয়তান সেখানে ভিন্ন নিয়্যাতের সংমিশ্রন ঘটিয়ে আমল বরবাদ করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বান্দার নিয়্যাত সহীহ থাকেনা,যার কারনে কষ্ট করা সত্ত্বেও কোন প্রতিদান বিরাদ্দ থাকেনা।এটাই হল নিয়্যাতের দুর্বলতা।তাই নেক নিয়্যাতে কোন কাজ শুরু করলে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কাজ শুরু করা উচিৎ যেন শেষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ নিয়্যাতের উপর অটল অবিচল থাকা যায়।
যেমনঃকুরবানির ক্ষেত্রে প্রথমে নিয়্যাত ঠিক থাকলেও পরে তা একমাত্র গোস্ত খাওয়ার নিয়্যাতে পরিনত হতে পারে। উম্মাহর উপকার করার নিয়্যাতে কেউ হালাল ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীতে অধিক মুনাফার লোভে পড়ে কেউ ব্যবসায় হারাম ঢুকাতে পারে বা সাধ্যের বাহিরে দাম বাড়িয়ে বা ভেজাল মিশ্রিত করে উম্মাহর ক্ষতিও করতে পারে।ইসলামী শিক্ষাদানের উদ্যেশ্যে কেউ দ্বীনি জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র খুলে তা নিয়্যাতের দুর্বলতার কারনে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হতে পারে।অর্থাৎ পার্থিব কামনা বাসনা চলে আসতে পারে।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! এক ব্যক্তি জিহাদ করতে চায়, কিন্তু সে তাতে পার্থিব কোন স্বার্থ কামনা করে।’ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার জন্য কোন সওয়াব নেই। লোকটি ঐ একই কথা তিনবার ফিরিয়ে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বারেই উত্তরে বললেন, তার জন্য কোন সওয়াব নেই।(আবু দাঊদ)

আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পৃথিবী অভিশপ্ত এবং অভিশপ্ত তার মধ্যে যা কিছু আছে সে সকল (পার্থিব বিষয় ও) বস্তুও। তবে সেই বস্তু (বা কর্ম) নয় যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশা করা হয়।

জনপ্রিয় হওয়ার তাড়না বা লোক দেখানো বা লোক প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্খা বা লোক নিন্দার ভয়ে ইবাদাত ও একধরনে অশুদ্ধ নিয়্যাত এবং ইহাই হল সূক্ষ্ম শির্ক।এধরনের নিয়্যাতেও সে যা চায় তাই পায়।দুনিয়াতে সে প্রসিদ্ধ হয়,মুজাহিদ হিসেবে গন্য হয়,আলিম হিসেবে গন্য হয়,শহীদ হিসেবে গন্য হয়,বিখ্যাত হয়,মুসলিম লেখক হিসেবে জনপ্রিয় হয়।কিন্তু বিনিময়ে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়না শুধুমাত্র নিয়্যাতের কারনে।

মাহমূদ বিন লাবীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয় তা হল ছোট শির্ক। সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কী জিনিস? উত্তরে তিনি বললেন, রিয়া (লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল)। আল্লাহ আযযা অজাল্ল যখন (কিয়ামতে) লোকেদের আমলসমূহের বদলা দান করবেন তখন সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, তোমরা তাদের নিকট যাও, যাদেরকে প্রদর্শন করে দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখ, তাদের নিকট কোন প্রতিদান পাও কি না!(বায়হাকী)

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি শুনেছি, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ‘‘কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকদের পূর্বে যে ব্যক্তির প্রথম বিচার হবে সে হচ্ছে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সুতরাং সে তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, ‘ঐ নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কি আমল ক’রে এসেছ?’ সে বলবে ‘আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছি এবং অবশেষে শহীদ হয়ে গেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে বলে, অমুক একজন বীর পুরুষ। সুতরাং তা-ই বলা হয়েছে।’ অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) আদেশ করা হবে এবং তাকে উবুড় ক’রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
দ্বিতীয় হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে ইলম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে (পৃথিবীতে প্রদত্ত) তাঁর সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, ‘এই সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কি আমল ক’রে এসেছ?’ সে বলবে, ‘আমি ইলম শিখেছি, অপরকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টি-লাভের জন্য কুরআন পাঠ করেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে ইলম শিখেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে আলেম বলে এবং এই উদ্দেশ্যে কুরআন পড়েছ, যাতে লোকেরা তোমাকে ক্বারী বলে। আর (দুনিয়াতে) তা বলা হয়েছে।’ অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উবুড় ক’রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তৃতীয় হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার রুযীকে আল্লাহ প্রশস্ত করেছিলেন এবং সকল প্রকার ধন-দৌলত যাকে প্রদান করেছিলেন। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া সমস্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, ‘তুমি ঐ সকল নেয়ামতের বিনিময়ে কি আমল ক’রে এসেছ?’ সে বলবে, ‘যে সকল রাস্তায় দান করলে তুমি খুশী হও সে সকল রাস্তার মধ্যে কোনটিতেও তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে খরচ করতে ছাড়িনি।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এ জন্যই দান করেছিলে; যাতে লোকে তোমাকে দানবীর বলে। আর তা বলা হয়েছে।’ অতঃপর (ফেরেশতাবর্গকে) হুকুম করা হবে এবং তাকে উবুড় ক’রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
(মুসলিম,তিরমিয়ী,নাসায়ী,আহমাদ )

৩। নিয়্যাতের পূর্বশর্ত

নিয়্যাতের পূর্বশর্ত হল সঠিক ইলম অর্জন করা।অর্থাৎ যে বিষয়ে নিয়্যাত করা হয় সে বিষয় সংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা।সঠিক ইলমের অভাবে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ নিয়্যাত দিয়েই সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়।
যেমনঃ কেউ দান করার নিয়্যাতে মন্দিরে বা মাজারে দান করলেই তার কোন পুরষ্কার নেই।কারন, মন্দিরে হয় শির্কের কর্মকান্ড এবং মাজারে হয় বিদায়াতের কর্মকাণ্ড। দুইটাই শরীয়াহ বিরোধী কাজ।

৪। নিয়্যাত,ইলম, আমল এবং ফলাফলের সম্পর্ক

নিয়্যাত, ইলম,আমল এবং ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক একই সুতোয় গাঁথা মালার মত।এ চারটি কাজের সমন্বয় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে নিয়্যাত অনুযায়ী ফলাফল পাওয়া অসম্ভব।লিচু গাছের চারা লাগিয়ে যেমন আম পাওয়া যায়না,তেমনি এক নিয়্যাতে কাজ করে ভিন্ন ফলাফল আশা করলে সেই ফল পাওয়া অসম্ভব।

যেমনঃকেউ বিয়ের জন্য দ্বীনদার পাত্র/পাত্রী খুজতে গিয়ে দ্বীনদারিতার চেয়ে দুনিয়াবি বিষয়কেও অধিক প্রাধান্য দিয়ে বিয়ে করার পর যদি সে জীবনসঙ্গীর পক্ষ থেকে দ্বীনদারিতার কল্যান এবং শান্তি আশা করে তবে সেটা একান্তই অবাস্তব চাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিতে হলে তাকে অবশ্যই নিজেকেও সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে এবং পাত্র/পাত্রীও সেভাবেই নির্বাচন করতে হবে।তাহলেই সঙ্গীর পক্ষ থেকে দুনিয়ার হাসানা পাওয়া সম্ভব।

তেমনি কেউ যদি আল্লাহর কাছে দুনিয়াবী কোন উদ্যেশ্যে সন্তান চায় আল্লাহর কাছে আল্লাহ পাক তাকেও সন্তান দেবেন সেই উদ্যেশ্যে হাসিলেই।যেমনঃ লোকে নিসন্তান/বন্ধ্যা বলবে এই ভয়ে,সম্পত্তি ভাইয়েরা অধিক পাবে এই ভয়ে পূত্র সন্তান চাওয়া,সম্পত্তি আত্মীয় স্বজন পাবে সব এই ভয়ে সন্তান চাওয়া,স্বামী আরেক বিয়ে করবে বা স্ত্রী চলে যাবে এই ভয়ে সন্তান চাওয়া,সন্তান আয় উপার্জনের মাধ্যম হবে,বৃদ্ধ বয়সে দেখভালের জন্য সন্তান লাগবে,বংশপ্রদীপ হিসেব ইত্যাদি।

কিন্তু নবী-রাসূলগনের সন্তান চাওয়ার একমাত্র উদ্যেশ্য ছিল নবীদের ওয়ারিশের পরম্পরা ঠিক রাখার জন্য,নেক সন্তান পাওয়ার জন্য যারা স্বলাত কায়েমকারী হবে,মুজাহিদ হবে,দানশীল হবে,আল্লাহর হুকুম পালনকারী হবে,কুরআন সংরক্ষনকারী হবে,আল্লাহর সন্তুষ্টভাজন হবে,দ্বীনের পথে সাদাকায়ে জারিয়াহ হবে।মুমিন বান্দাদের উদ্যেশ্যেও তাই হয়।শুধু চেয়েও তাঁরা ক্ষান্ত হোন না,বরং তাঁরা নিজেরাও যেমন ছিলেন সৎকর্মশীল,তেমনি সন্তানদের তরবিয়াত দানেও ছিল তাদের একনিষ্ঠ চেষ্টা প্রচেষ্টা।লোকমান হাকিমের সন্তানের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ নাসীহা এবং সকল নবী রাসূলদের তাদের সন্তানদেরকে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা,শিক্ষা এবং উপদেশ ছিল কেয়ামত পপর্যন্ত সকল পিতামাতার প্রতি নিদর্শন সরুপ।নেক সন্তান শুধু পিতামাতার পরকালীন সম্মান এবং কল্যানের উসীলাই না,বরং নেক সন্তান একটি পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ও অনেক কল্যান,শান্তি এবং উপকার বয়ে নিয়ে আনে।তাই নিয়্যাতের পাশাপাশি সে বিষয়ে নবী,রাসূল,সাহাবীদের থেকে শিক্ষা অর্জন করে সে পথে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

কিন্তু নেক সন্তান প্রত্যাশা করে নিজে সুদ,ঘুষ,দুর্নীতি,চুরি,ডাকাতি,হারাম উপার্জন,বেপর্দা চলাফেরা ইত্যাদি সবধরনের শয়তানী বন্দেগী করে সন্তানের সঠিক তরবিয়াতের পেছনে না ছুটে সন্তানকে দুনিয়াবী চাকচিক্যের মধ্যে বড় করে তাকে নেক সন্তান হিসেবে পাওয়ার আকংখা করা বা সাদকায়ে জারিয়াহ হিসেবে পাওয়ার আকংখা করা বা তার থেকে দুনিয়াবি শান্তি,কল্যান প্রত্যাশা করা আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।
এভাবেই খাবার গ্রহন,আতিথিয়েতা,উপার্জন,পোষাক-পরিচ্ছদ গ্রহন,দুনিয়াবী জীবিকার জন্য শিক্ষা গ্রহন থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোট বড় কাজে একজন মুমিনের নিয়্যাত,ইলম এবং আমলের উপরেই তার ফলাফল নির্ভর করে।এ চারটি বিষয় বিনি সুতোয় গাঁথা।তাই নিয়্যাত অনুযায়ী ফলাফল পেতে হলে মাঝখানের দুটি উপাদান ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত।

৫। হিজরাতের অর্থ এবং প্রসঙ্গ

হিজরত একটি আরবী শব্দ।এর অর্থ ত্যাগ করা,ছেড়ে যাওয়া,সম্পর্ক ছিন্ন করা।ইসলামী শরীয়াহ এর দৃষ্টিকোন থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্যেশ্যে দ্বীন পালনের সহযোতার জন্য "দারুল হারব" (বেদ্বীন দেশ) থেকে "দারুল ইসলাম"(ইসলাম প্রতিষ্ঠিত দেশ) এ প্রত্যাবর্তন হল হিজরত।যেখানে ইসলামের নির্দেশ পালনে বাধা বিপত্তি,অত্যাচার, নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয় সেখান থেকে এমম এক জায়গায় প্রত্যাবর্তন করা যেখানে দ্বীন পালন সহজ হয়।হিজরত একটি মৌলিক এবং কঠিনতম ইবাদাত।দ্বীনের খাতিরব নিজের মাতৃভূমি, প্রিয়জনদের ছেড়ে দেশান্তর হওয়া অবশ্যই একটি কষ্টসাধ্য কাজ।তাই এই কষ্টসাধ্য ইবাদাতে নিয়্যাতের বিশুদ্ধতা অতীব জরুরি। না হয় এত কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সওয়াব ই বরাদ্দ থাকবেনা।ইসলামের প্রতিটি ইবাদাত ই কষ্টসাধ্য।দুনিয়া হল মুমিনের জন্য কারাগার সরুপ।হালাল উপার্জন,পর্দা,আল্লাহর পথে জিহাদ,যথাসময়ে জামায়াতে স্বলাত আদায় করা,ন্যায় নিষ্ঠ কথা বলা,জিহব্বা সংযত করা ইত্যাদি সব কাজ ই অনেক কষ্টসাধ্য। তাই এত কষ্টের কাজ যেন বিফলে না যায় সেজন্য নিয়্যাতকে বার বার খালেস করা উচিৎ।

✅হাদিস থেকে শিক্ষা

১.কাজের প্রতিদান নির্ভর করবে সঠিক নিয়্যাতের উপরে।

২.প্রতিটি কাজের পূর্বে বার বার নিয়্যাত যাচাই করা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টী অর্জন সম্ভব হয় এবং রহমতপ্রাপ্ত হওয়া যায়।

৩.হজ্জ্ব এবং উমরাহ ব্যতীত আর কোন ইবাদাতেই আনুষ্ঠানিকভাবে মুখে নিয়্যাত উচ্চারন করা শরীয়াহ সম্মত নয়।

৩.নিয়্যাতের পূর্বশর্ত হল সঠিক ইলম অর্জন করা
আমল না করলে ইলম বিদায় নেয়।আমল বিহীন ইলম হল ফলবিহীন গাছের মত
আর ইলম বিহীন আমল হল পন্ডশ্রমের মতই
নিয়্যাত,ইল,আমল এবং ফলাফল হল একই সুতোয়া গাঁথা মালা।

৪.জীবনে শরীয়াহস্মমতভাবে চলার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করা ফরজ
যেকোন কাজের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান পাওয়ার জন্য নিয়্যাত বিশুদ্ধ হওয়া,ইলম সঠিক হওয়া,অর্থাৎ সুন্নাহসম্মতভাবে সম্পন্ন হওয়া অন্যতম শর্ত।

৫.বান্দার জীবন এবং জীবিকার অপরিহার্য কাজগুলিই ইবাদাতে পরিনত হতে পারে শুধুমাত্র নিয়্যাত বিশুদ্ধ এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে হলেই।

৬.দৈনন্দিন জীবনের ছোট, বড়, ব্যক্তিগত,সামাজিক,পারিবারিক,প্রশাসনিক সব কাজের মধ্য দিয়েই পরকালীন প্রতিদান পাওয়া সম্ভব যদি তা সুন্নাহসম্মতভাবে হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়।

আল্লাহ সোবহানু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে রাসূলের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পথচলার তৌফিক দান করুন!আমিন!

Share
f𝕏W✉

Send a Comment

Your comment will be sent privately to the MCC Newsletter team and will not be published on the website.

Source note: Hadith Arabic and translation require independent verification.

Back to August issue

About this contribution

The submitted text is retained in its original language and sequence. Personal contact details are excluded.

© Muslim Circle of Canada ·